জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশ ইউনিট থেকে লুট হওয়া বিপুল সংখ্যক অস্ত্র-গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের সিংগারপুরে মাছ ধরার সময় জেলের জালে একটি শটগান উঠে আসে, যা ওই সময় আড়াইহাজার থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্রগুলোর একটি বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ এখনও অপরাধীদের হাতেই রয়েছে এবং বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর দেশের বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব স্থাপনা থেকে মোট ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৬ লাখ ৫২ হাজার ৮টি গোলাবারুদ লুট হয়। লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রাইফেল, এসএমজি, এলএমজি, পিস্তল, শটগান, গ্যাসগান, কাঁদানে গ্যাস লঞ্চার ও বিভিন্ন গ্রেনেড। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর যৌথ অভিযান শুরু হয়। চলতি বছরের ৫ জুলাই পর্যন্ত এই অভিযানে ৪ হাজার ৪৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮৬৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু এখনো ১ হাজার ৩১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ২ লাখ ৫৭ হাজার ১৩৯টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি।

অন্যদিকে, একই সময়ে দেশের কয়েকটি কারাগারে বন্দীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। কারা অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ওই সময় কারাগার থেকে ২ হাজার ২৪০ জন বন্দী পালিয়ে যান। এছাড়া কারাগার থেকে ৯৪টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেল লুট হয়। পালানো বন্দীদের মধ্যে ৬৮৩ জনকে এখনো গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। লুট হওয়া ২০টি শটগান ও চায়নিজ রাইফেলও এখনো উদ্ধার হয়নি।

কারা অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানিয়েছেন, ধরা না পড়া বন্দীদের মধ্যে ৬৯ জন ঝুঁকিপূর্ণ। তাদের মধ্যে ৬০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং ৯ জন চিহ্নিত জঙ্গি। লুট হওয়া কিছু চায়নিজ রাইফেল ও শটগান উদ্ধার না হওয়ার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেছেন। তিনি আরও জানান, র্যাব ও পুলিশ মাঝেমধ্যেই সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের গ্রেপ্তার করছে এবং দেশের কারাগারগুলোর নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তবে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কিছুটা নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

লুট হওয়া অস্ত্র বিক্রিতে পুলিশ সদস্যের জড়িত থাকার প্রমাণও পাওয়া গেছে। গত বছরের ৩ মার্চ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় গণপিটুনিতে দুজনের মৃত্যুর পর ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানায়, এই পিস্তলটি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া। ওই পিস্তল দিয়ে নিহত ব্যক্তিদের একজন নেজাম উদ্দিন গুলি ছুড়লে স্থানীয় এক দোকানিসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন। তদন্তে জানা যায়, এই অস্ত্র কেনাবেচায় চাঁদপুরে কর্মরত পুলিশ কনস্টেবল মো. রিয়াদ জড়িত ছিলেন। ২১ মার্চ কনস্টেবল রিয়াদসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে আরেকটি বিদেশি পিস্তল ও সাতটি গুলি উদ্ধার করা হয়, যা লোহাগাড়া থানা থেকে লুট হওয়া। গ্রেপ্তারের পর রিয়াদ ও তাঁর দুই সহযোগী চট্টগ্রামের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

একই বছরের ১৯ জুন চট্টগ্রামের জেলেপাড়া এলাকা থেকে সাইদুর রহমান মাসুম ওরফে রেড মাসুম নামে এক সন্ত্রাসী চক্রের প্রধানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর কাছ থেকে উদ্ধার করা পিস্তলটি পাহাড়তলী থানা থেকে লুট হওয়া। এই অস্ত্র ব্যবহার করে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন স্থানে ছিনতাই, ডাকাতিসহ অন্যান্য অপরাধ করতেন। থানা থেকে লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে খুনখারাবি ও চাঁদা আদায়ের অভিযোগে আরও কয়েকজন সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। ধীরগতিতে হলেও মাঝেমধ্যে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। তিনি মনে করেন না যে এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।