চট্টগ্রামের আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন, যিনি ডেভিড ইমন নামেও পরিচিত, গ্রেপ্তার হওয়ার পরও তাঁর বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন ভুক্তভোগীরা। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে শোনা গেছে, তিনি এক ইন্টারনেট ব্যবসায়ীকে ফোন করে এক কোটি টাকা চাঁদা দাবি করছেন। অডিওতে ইমনকে বলতে শোনা যায়, ‘এক কোটি বলতেছি এক কোটি নিব, চার আনাও কম হবে না।’ প্রায় দুই মাস আগে ওই ব্যবসায়ীকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ভয়ে গত জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ইমনকে ১০ লাখ টাকা দেন। তবে এ ঘটনায় তিনি থানায় কোনো মামলা করেননি, এমনকি পুলিশকেও জানাননি। যোগাযোগ করা হলে এ বিষয়ে কথা বলতেও রাজি হননি তিনি। ফাঁস হওয়া ৪৩ সেকেন্ডের অডিওতে ইমন ওই ব্যবসায়ীকে আরও বলেন, ‘একটি জিনিস মাথায় রাখবেন, আমি যদি ঘরে কিংবা অফিসে ছেলেদের পাঠাই, তাহলে এক কোটি বলেছি এক কোটি নিব, দশ লাখ বলেছি দশ লাখই নিব। চার আনা, আট আনাও কম হবে না। যদি....(দেশের একজন শীর্ষ ব্যক্তির নাম) বললেও কিছু হবে না। এখনো সময় আছে, বেঁচে থাকলে অনেক টাকাপয়সা আয় করবেন। আর বেঁচে না থাকলে টাকাপয়সা দিয়ে কী করবেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত সময় দিচ্ছি। চিন্তাভাবনা করে দেখেন, কী করবেন।’
ইমনের হুমকিতে ১০ লাখ টাকা দেওয়া ওই ব্যবসায়ী কথা বলতে রাজি না হওয়ায় চট্টগ্রামের ইন্টারনেট ব্যবসায়ীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) চট্টগ্রাম বিভাগের আহ্বায়ক রাজীব শাহরিয়ারের সঙ্গে কথা বলে প্রথম আলো। তিনি জানান, চট্টগ্রামের আইএসপিএবির সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে জীবনের ভয়ে সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিয়ে আসছে। তাঁরা পুলিশ কিংবা সংগঠনকে বিষয়টি জানাতেন না। পরিস্থিতি এমন ছিল যে তাঁরা বিষয়টি কারও সঙ্গে আলাপও করতেন না, বরং আপস করে টাকা দিয়ে দিতেন। রাজীব শাহরিয়ার আরও বলেন, এখন থেকে পুলিশ কমিশনার ও জেলা পুলিশ সুপার ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেছেন, কেউ চাঁদাবাজির শিকার হলে যাতে বিষয়টি তাঁদের জানানো হয়। তিনি আরও বলেন, ‘ইমনদের মতো চিহ্নিত সন্ত্রাসী, যাঁরা নগরবাসীকে আতঙ্কিত করে রাখেন, তাঁরা যাতে জামিনে বেরিয়ে আসতে না পারেন। পাশাপাশি কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা উচিত।’
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (গণমাধ্যম) আমিনুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি ও হুমকির বিষয়ে ভুক্তভোগীরা পুলিশকে অবহিত করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতিমধ্যে ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের ধরতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত আছে। নগরবাসীর আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। গত ২৯ জুলাই সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে তিন সহযোগীসহ ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। পরে গত রোববার তাঁকে ফটিকছড়ি থানার হত্যা ও অস্ত্র মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। এরপর তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে নেয় জেলা পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ইমন পুলিশকে জানান, তিনি মাসে গড়ে এক কোটি টাকা চাঁদা আদায় করতেন। এর অর্ধেক চলে যেত বিদেশে থাকা পলাতক ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ আলীর কাছে। বাকি টাকা তিনি নিজের কাছে রাখতেন। পুলিশকে ইমন আরও জানান, চাঁদাবাজির আগে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহ করা হতো। এরপর চিহ্নিত ব্যবসায়ীর ব্যবসার খুঁটিনাটি ও পরিবারের সদস্যদের তথ্যও সংগ্রহ করতেন দলের লোকজন। সব তথ্য হাতে পাওয়ার পর বিদেশি নম্বর থেকে ব্যবসায়ীকে ফোন করা হতো। ভয় দেখানো হতো গুলি করার এবং পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি করার। কথামতো টাকা না দিলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিংবা বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করা হতো। এভাবে মাসে প্রায় কোটি টাকা চাঁদা আদায় করা হতো বলে পুলিশকে জানিয়েছেন ইমন।
ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানে ছিলেন। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তাঁর দলে যুক্ত হন ইমন। সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ইমন বড় সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হয়ে ওঠেন।




