ডায়েরি অব এ সিইও-তে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজির প্রতিষ্ঠাতা মাইকেল সায়লার তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেন। সেখানে তিনি টেসলার প্রধান ইলন মাস্কের একটি বহুল আলোচিত ভবিষ্যদ্বাণীর সঙ্গে সরাসরি দ্বিমত পোষণ করেন। মাস্ক দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) অগ্রগতির ফলে একদিন মানুষের কাজ করা ঐচ্ছিক হয়ে উঠতে পারে, পণ্য ও সেবার ব্যাপক প্রাচুর্য দেখা দেবে এবং অর্থের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পাবে—যাকে তিনি “সার্বজনীন উচ্চ আয়” হিসেবে বর্ণনা করেন। কিন্তু ৬১ বছর বয়সী সায়লার, যাঁর বর্তমান সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩৩০ কোটি ডলার এবং যিনি বিটকয়েনকে তাঁর ব্যবসার কেন্দ্রে রেখেছেন, এই ধারণাকে সম্পূর্ণভাবে গ্রহণ করতে রাজি নন।

সাক্ষাৎকারের সঞ্চালক স্টিভেন বার্টলেট যখন জিজ্ঞেস করেন মাস্কের পূর্বাভাসের সঙ্গে তিনি একমত কিনা, তখন সায়লার স্পষ্ট ভাষায় বলেন—প্রত্যেকের নিজের ব্যক্তিগত জেট, ইয়ট বা হ্যাম্পটনের মতো বিশাল বাড়ি পাওয়ার সুযোগ নেই। তাঁর মতে, এআই যদি জীবনযাপনের মৌলিক প্রয়োজনীয়তাকে নাটকীয়ভাবে সস্তা করে তোলে, এমনকি বিনামূল্যে সরবরাহ করতেও সক্ষম হয়, তবুও অর্থের মূল্য সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হবে না। কারণ মৌলিক চাহিদা পূরণ হলে মানুষের মনোযোগ স্বাভাবিকভাবেই আরও দুষ্প্রাপ্য ও মর্যাদাসূচক সম্পদের দিকে সরে যাবে।

এই প্রসঙ্গে সায়লার তুলনামূলক ব্যাখ্যা দেন। যদি সবাইকে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়, তবে অনেকেই ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যসেবার দিকে ঝুঁকবেন। যদি প্রত্যেককে একটি বাড়ি দেওয়া হয়, কেউ কেউ দ্বিগুণ বড় বাড়ির মালিক হতে চাইবেন। তাঁর ভাষায়, মানুষ সর্বদাই আরও কিছু চাইবে, কারণ আমরা মর্যাদাকামী প্রাণী। এটিই বাস্তবতার একটি কঠোর কিন্তু সত্য দিক—এই মন্তব্য করেন তিনি।

ইতিহাসের দৃষ্টান্ত টেনে সায়লার আরও যুক্তি দেন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ইতোমধ্যেই বহু বিলাসিতাকে সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে এসেছে। একসময় রাজা-রানীরাও নির্ভরযোগ্যভাবে পেতেন না এমন পরিষ্কার জল, উন্নত চিকিৎসা কিংবা দাঁতের কৃত্রিম মুকুট—যা আজ উন্নত বিশ্বের অধিকাংশ মানুষের জন্য স্বাভাবিক বিষয়। সপ্তম হেনরির সময়ে ডেন্টাল ক্রাউন বা এক্স-রে ছিল না, কিন্তু আজ আধুনিক চিকিৎসাসেবায় শিশুমৃত্যুর হার অনেক কমে গেছে; জীবন নিরাপদ, বাতাস ও খাদ্য পরিষ্কার—আর এসব কিছুই প্রযুক্তির দান। তবুও এই প্রাচুর্য বিলাসিতার আকাঙ্ক্ষা কমায়নি, বরং বিলাসিতার মানদণ্ডকে আরও উপরে তুলেছে।

বর্তমান বাজারেও এর প্রতিফলন স্পষ্ট। সায়লার বলেন, প্রত্যেকের কাছে গাড়ি থাকলেও পোরশে কিনতে চাওয়ার মানুষ কম নয়। নিউ ইয়র্ক শহরে প্রতিদিন তিন ডলারে পেট ভরানো সম্ভব হলেও মানুষ তিনশ ডলার খরচ করে রেস্তোরাঁয় খেতে যান—কারণ সেখানে শুধু খাবার নয়, একটি অভিজ্ঞতা ও মর্যাদার প্রতীক জড়িত। তাঁর মতে, মানবসমাজ সর্বদা নতুন “ট্রফি অ্যাসেট” বা বিজয়ের নিদর্শন হিসেবে গণ্য হওয়া বিলাসবহুল পণ্য উদ্ভাবন করে।

অন্যদিকে, সিলিকন ভ্যালির অন্যান্য নেতৃবৃন্দও এআই-কে একটি প্রাচুর্যের যুগের সূচনা হিসেবে দেখছেন, যদিও সায়লারের সঙ্গে তাঁদের মতের কিছু পার্থক্য রয়েছে। গুগল ডিপমাইন্ডের চেয়ারম্যান পদে সম্প্রতি স্থানান্তরিত হওয়া ডেনিস হাসাবিস পূর্বাভাস দিয়েছেন, আগামী দশ থেকে পনেরো বছরের মধ্যে একটি নতুন সোনালি যুগ ও নতুন রেনেসাঁ শুরু হতে পারে। তাঁর মতে, চিকিৎসা ও শক্তিখাতে যুগান্তকারী অগ্রগতি হবে এবং একদিন মানবজাতি তারার দিকে যাত্রা করে গ্যালাক্সি অন্বেষণ করতে সক্ষম হবে। একইভাবে, বিলিয়নিয়ার ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট বিনোদ খোসলাও মনে করেন এআইয়ের মাধ্যমে প্রচুর সম্পদ সৃষ্টি হবে, তবে এর অর্থনৈতিক সুফল নির্ভর করবে সরকারের প্রতিক্রিয়ার উপর। তাঁর মতে, উৎপাদনশীলতা গড় আয় বাড়াবে, কিন্তু চাকরির স্থানচ্যুতি এর বিপরীত প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তিনি সার্বজনীন মৌলিক আয়ের ধারণাকে একটি সম্ভাব্য সমতাবিধায়ক হিসেবে দেখেন এবং গড় আয়ের সঙ্গে মধ্যম আয়ের সমতা রক্ষার উপর জোর দেন।

এই বিতর্কের মূলে রয়েছে একটি মৌলিক প্রশ্ন—প্রযুক্তি যখন প্রাচুর্য এনে দেবে, তখন মানুষের আকাঙ্ক্ষা কীভাবে রূপ নেবে? সায়লারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মানবসমাজের মর্যাদা ও প্রতিযোগিতার প্রবৃত্তি কখনোই সম্পূর্ণরূপে মুছে যাবে না। ফলে অর্থের ভূমিকা হয়তো রূপান্তরিত হতে পারে, কিন্তু তার প্রাসঙ্গিকতা হারানোর সম্ভাবনা কম। এই প্রতিবেদনটি প্রথমে ফরচুন ডট কম-এ প্রকাশিত হয়েছিল।