দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে ‘বন্দে মাতরম’ গানকে ঘিরে। তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ ও সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাসীন বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদি সরকার এই দেশাত্মবোধক গানকে হাতিয়ার করে কংগ্রেসের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বিজেপির অভিযোগ, ধর্মনিরপেক্ষতার আড়ালে কংগ্রেস এখনও তুষ্টিকরণের রাজনীতি করছে এবং বন্দে মাতরম নিয়ে তাদের সাম্প্রতিক ভূমিকা তা প্রমাণ করে। হিন্দু জাতীয়তাবাদী এই এজেন্ডাকে সামনে রেখেই আগামী দিনের রাজনৈতিক লড়াইয়ের কৌশল সাজাতে চায় বিজেপি।
বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির গত বুধবারের বৈঠকে গৃহীত একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। সেখানে ঠিক হয়, দলীয় কর্মসূচি ও অনুষ্ঠানে ‘বন্দে মাতরম’ গানের প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হবে, পুরো গানটি নয়। কংগ্রেস নেতৃত্ব এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ১৯৩৭ সালের ঐতিহাসিক ঘটনার উল্লেখ করেন। সে বছর কলকাতায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শক্রমে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসুসহ তৎকালীন শীর্ষ নেতারা প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে তারা জানান। এছাড়া ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধান পরিষদের বৈঠকে এই গানকে জাতীয় গানের মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। কংগ্রেসের মুখপাত্র জয়রাম রমেশ জানান, ঐতিহাসিক সেই সিদ্ধান্তগুলোকেই অনুসরণ করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, বিজেপি এই সিদ্ধান্তকে ‘আশ্চর্যজনক ও দেশবিরোধী’ আখ্যা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অভিযোগ করেছেন, কংগ্রেসের মুসলিম তোষণ নীতিই দেশভাগের কারণ ছিল এবং সেই রাজনীতি এখনও অব্যাহত রেখেছে তারা। তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে কংগ্রেস বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পাশাপাশি যাঁরা এই গান গাইতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন বা জেল খেটেছেন, তাঁদেরও অসম্মান করছে। বিজেপি নেতারা কংগ্রেসের কাছে ক্ষমা চাওয়ারও দাবি তুলেছেন এবং কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে নতুন আইনে অভিযোগ দাখিল করেছেন। প্রসঙ্গত, বন্দে মাতরমের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে চলতি বছর কেন্দ্রীয় সরকার জাতীয় সম্মানের অবমাননা প্রতিরোধ (সংশোধনী) বিল পাস করেছে, যাতে এই গানের পুরো ছয়টি স্তবক সরকারি অনুষ্ঠানে গাওয়া বাধ্যতামূলক এবং অমর্যাদা করলে তিন বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এরই মধ্যে এই বিতর্কে সামিল হয়েছেন অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুর ও বিজেপি সাংসদ কঙ্গনা রনৌত। শর্মিলা ঠাকুর মত দিয়েছেন যে, প্রথম দুই স্তবকে মাতৃভূমির প্রাকৃতিক রূপের বর্ণনা থাকায় তা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু পরবর্তী স্তবকগুলোতে দুর্গা, লক্ষ্মী, সরস্বতীর মতো হিন্দু দেবদেবীর উল্লেখ থাকায় একেশ্বরবাদী ধর্মাবলম্বীদের কাছে তা গ্রহণ কঠিন হতে পারে। তিনি মনে করেন, সব ধর্মের মানুষকে একসূত্রে বাঁধতে প্রথম দুই স্তবকই যথেষ্ট। এই মন্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে কঙ্গনা রনৌত ইনস্টাগ্রামে লেখেন, শিল্প ও কবিতা সম্পর্কে শর্মিলা ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। তিনি বলেন, কবিতায় রূপক ব্যবহার শিল্পেরই অংশ এবং শুধু ধর্মীয় আচার হিসেবে দেখলে এর শৈল্পিক তাৎপর্য খাটো করা হয়। একই সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দের প্রসঙ্গ টেনে তিনি শর্মিলাকে হিন্দু-মুসলিম মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান।




