সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত সহকারী নাটালি হার্পকে ঘিরে সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৩৫ বছর বয়সী এই সহকারী হোয়াইট হাউসের ওয়েস্ট উইংয়ে এক বছরের বেশি সময় ধরে অবস্থান করলেও নিয়মিত নিরাপত্তা ছাড়পত্র গ্রহণে রাজি হননি। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এমএস নাওকে জানিয়েছেন যে, হার্প কেন অন্যান্য কর্মচারীর মতো স্বাভাবিক যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেননি, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ডানপন্থী ওয়ান আমেরিকা টেলিভিশন চ্যানেলের সাবেক উপস্থাপক হিসেবে পরিচিত নাটালি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাপক মনোযোগ কেড়েছেন। হাড়ের ক্যানসার থেকে সেরে ওঠা এই সহযোগীর ঘনিষ্ঠতার আরও একটি প্রমাণ মেলে সাম্প্রতিক সময়ে। সম্ভাব্য ইরানি হামলার আশঙ্কার মধ্যে তুরস্ক থেকে ছেড়ে যাওয়া একটি সামরিক বিমানে ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা অল্প কয়েকজন কর্মীর মধ্যে নাটালিও ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের অনেকেই ট্রাম্পের প্রতি তাঁর গভীর আনুগত্য এবং প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ মহলে তাঁর ব্যাপক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান সম্প্রতি ট্রাম্পের ক্ষমতায় ফেরার বিষয়ে লেখা একটি বইয়ে নাটালিকে প্রভাবশালী দ্বাররক্ষক হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, নাটালি আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার বাইরে থেকে বিভিন্ন তথ্য ট্রাম্পের কাছে পৌঁছে দেন। হ্যাবারম্যান এর আগে এমএস নাওকে বলেছিলেন, আক্ষরিক অর্থে তিনি প্রায় প্রতিটি বৈঠকে উপস্থিত থাকেন। ফলে প্রশাসনের ভেতরে তাঁর অবস্থান শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত নৈকট্যও সমানভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
তবে মূল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো তাঁর নিরাপত্তা ছাড়পত্র। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত হার্পকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য কয়েক দফা সময় বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়েছিল। অবশেষে প্রেসিডেন্টের সরাসরি হস্তক্ষেপের পর তিনি নথি দাখিল করেন। ‘এসএফ-৮৬’ নামে পরিচিত ওই ফরমে আবেদনকারীর আর্থিক ইতিহাস, পূর্ববর্তী বসবাসের ঠিকানা এবং বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করতে হয়।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আসার প্রথম বছরে হার্পের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে সিক্রেট সার্ভিস ও তাঁর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সহযোগী উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। অপরদিকে প্রশাসন প্রকাশ্যে এই উদ্বেগগুলো উড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে তারা দাবি করছেন, নাটালির কাছে এখন প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাড়পত্র রয়েছে। হোয়াইট হাউসের বিদায়ী প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট এমএস নাওকে বলেন, অন্যান্য সবার মতো নাটালি হার্পেরও নিরাপত্তা ছাড়পত্র রয়েছে এবং তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দলের একজন বিশ্বস্ত ও পরিশ্রমী সদস্য।
একটি সূত্র আরও জানিয়েছে, কর্মকর্তারা নাটালির সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ সীমিত করতে কিছু সূক্ষ্ম পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ওই সূত্রের ভাষ্য, হার্প অত্যন্ত জেদি স্বভাবের এবং তাঁরা যে তাঁর সঙ্গে দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করছেন, তা তিনি বুঝতে পারেননি বা বুঝতে চাননি।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একবার ট্রাম্পকে ভালোবাসায় পূর্ণ কয়েকটি চিঠি দিয়েছিলেন নাটালি। এর একটিতে লেখা ছিল, ‘আপনিই আমার কাছে সবকিছু।’ আরেকটির শেষে লেখা ছিল, ‘আমার পুরো হৃদয় দিয়ে, নাটালি।’ তাঁর ভাই, যার সঙ্গে বর্তমানে নাটালির কোনো যোগাযোগ নেই, তাঁদের সম্পর্ককে ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ বলে বর্ণনা করেছেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জর্জিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর জন অসফ গত সপ্তাহান্তে আটলান্টায় সমর্থকদের এক সমাবেশে বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি ওই প্রতিবেদনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করতে চান না; বরং তিনি তাঁর বলরুম তৈরি করতে এবং নাটালিকে সঙ্গে নিয়ে ভ্রমণ করতে চান। সিএনএনের ভাষ্যকার স্কট জেনিংসসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী রক্ষণশীল ব্যক্তি অসফের এই মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। এ সপ্তাহে জেনিংস বলেন, নাটালি একজন বুদ্ধিমান ও প্রতিভাবান মানুষ, যিনি তাঁর দেশ ও প্রেসিডেন্টের সেবা করতে চান। অপরদিকে ডেমোক্র্যাটদের কাছে বিষয়টি হলো, তিনি সেখানে আছেন কারণ তিনি একজন সুন্দরী স্বর্ণকেশী নারী এবং তাঁর বসের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে শারীরিক সম্পর্কে জড়িত—অন্যথায় এমন চাকরি তিনি কীভাবে পেলেন?
হোয়াইট হাউসও ট্রাম্পের এই বিশ্বস্ত সহযোগীর পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছে। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র এর আগে দ্য ইনডিপেনডেন্টকে বলেছিলেন, নাটালি হার্প হোয়াইট হাউসের একজন অত্যন্ত প্রিয় কর্মকর্তা। ভুয়া খবর প্রচারকারী সংবাদমাধ্যম কখনোই বুঝতে পারবে না, তাঁর মতো বিশ্বস্ত ও প্রশংসিত হওয়া কেমন। এই বিতর্কের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, প্রশাসনের ভেতরে নাটালি হার্পের অবস্থান শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত নৈকট্যও সমানভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।




