বঙ্গোপসাগরের মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত সন্দ্বীপ দ্বীপের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম দিলওয়ার খান, যিনি দিলাল রাজা নামে অধিক পরিচিত। মোগল ও আরাকানি শাসক এবং পর্তুগিজ জলদস্যুদের মধ্যে দখল-পাল্টা দখলের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্যেও তিনি প্রায় পাঁচ দশক ধরে দ্বীপটিকে স্বাধীনভাবে শাসন করেছেন। তাঁর শাসনকাল আনুমানিক ১৬১৬ থেকে ১৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, মোগল নৌবাহিনীর একজন পলাতক সেনাপতি ছিলেন দিলওয়ার খান। সুবাদার ইব্রাহিম খাঁর শাসনামলে তিনি নিজের অনুগত সৈন্যসামন্ত নিয়ে সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেন। তবে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, মোগল সুবাদার কাসিম খাঁর সময়, অর্থাৎ ১৬১৬ সালে তিনি ক্ষমতা দখল করেন। তাঁর আগে প্রায় এক দশক সন্দ্বীপ শাসন করেছিলেন সেবাস্তিয়ান গঞ্জালেজ তিবাউ নামের এক পর্তুগিজ জলদস্যু।
দিলাল রাজাকে কেন ‘প্রাচ্যের রবিন হুড’ বলা হয়, তার কারণ তাঁর শাসননীতি। ইস্টার্ন বেঙ্গল অ্যান্ড আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্সে উল্লেখ রয়েছে, তিনি ধনীদের ও বহিরাগতদের লুণ্ঠন করতেন, কিন্তু নিজের প্রজাদের ও দরিদ্র মানুষের রক্ষক ছিলেন। যুক্তরাজ্যের শেরউড ফরেস্টের লোককাহিনির নায়ক রবিন হুডের সঙ্গে তাঁর কর্মকাণ্ডের মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেক ইতিহাস লেখক। তবে এই জনশ্রুতির পেছনে কোনো অকাট্য দলিল বা লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়নি।
দিলাল রাজার জন্ম ও বেড়ে ওঠা নিয়ে নানা জনশ্রুতি প্রচলিত। মৌলভি মো. আব্দুল হালিমের লেখা অনুসারে, তিনি এক মুসলিম বণিকের সন্তান ছিলেন। বাবার মৃত্যুর পর নিঃস্ব মা তাঁকে ১০ বছর বয়সে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে রাখাল হিসেবে কাজ করতে পাঠান। একদিন মাঠে ঘুমন্ত অবস্থায় একটি বিশাল গোখরা সাপ তাঁর মাথার ওপর ফণা ধরে ছিল। ব্রাহ্মণ এটিকে রাজা হওয়ার লক্ষণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যা দিলালের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে উসকে দেয়। ২০ বছর বয়সে তিনি কিছু দুঃসাহসী যুবক নিয়ে দল গঠন করেন এবং সাগরে জাহাজডুবির মালামাল সংগ্রহ ও লুণ্ঠনের মাধ্যমে ক্রমে সন্দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেন।
শাসক হিসেবে দিলাল রাজা ছিলেন ন্যায়পরায়ণ। জাতি-ধর্মের ভেদাভেদ ছিল না তাঁর বিচারে। ছোট অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড বা অঙ্গচ্ছেদের মতো কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। তবে তিনি হিন্দু সমাজে জাতিভেদ প্রথার বিরোধী ছিলেন এবং বর্ণ বা ধর্ম নির্বিশেষে বিবাহের নিয়ম চালু করেছিলেন। তাঁর সময়ে সন্দ্বীপের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্ত পর্যন্ত খাল কাটা এবং দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণের কাজ হয়। সাংস্কৃতিকভাবেও দ্বীপটি সমৃদ্ধ ছিল; মধ্যযুগের বিখ্যাত কবি আবদুল হাকিমের জন্মও তাঁর সময়েই সন্দ্বীপে (মতান্তরে নোয়াখালী) হয়।
সমর কৌশলে দিলাল ছিলেন অনন্য। সন্দ্বীপের জলপথ ও প্রাকৃতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে তিনি দুর্ভেদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। নদীমুখের সরু নালার মুখে একটি দুর্গ ছিল, যা পাঁচজন বৃদ্ধও বন্দুক নিয়ে পাহারা দিলে হাজার সৈন্যেও অতিক্রম করতে পারত না। ১৬২৪ ও ১৬৪৪ সালে আরাকান বাহিনীকে তিনি কৌশলে পরাজিত করেন, বিশেষ করে দ্বিতীয় যুদ্ধে তাদের বিপুল পরিমাণ হাতি, ঘোড়া ও কামান হারাতে হয়।
শেষ পর্যন্ত মোগল সুবাদার শায়েস্তা খাঁ চট্টগ্রাম জয়ের পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে সন্দ্বীপ জয়ের সিদ্ধান্ত নেন। ১৬৬৫ সালের ৯ নভেম্বর মোগল সেনাপতি আবুল হাসানের নেতৃত্বে প্রথম আক্রমণে দুর্গটি দখল করা হয়। ৮০ বছরের বেশি বয়সী দিলাল বীরের মতো যুদ্ধ করে আহত হয়ে জঙ্গলে লুকিয়ে পড়েন। ১৮ নভেম্বর দ্বিতীয় আক্রমণে তিনি ধরা পড়েন এবং তাঁকে শিকলে বেঁধে ঢাকায় নেওয়া হয়। তাঁর পরিবারের ৯২ জন সদস্যসহ অন্যদেরও নেওয়া হয়। কারাগারে অল্প কিছু দিন পর তাঁর মৃত্যু হয়।
আজও সন্দ্বীপে দিলাল রাজার স্মৃতি জীবিত। তিনি নির্মিত দীর্ঘ রাস্তাটি ‘দেলোয়ার খাঁ’ সড়ক নামে পরিচিত। তাঁর কন্যার নামানুসারে ‘মুছাপুর’ এলাকা ও দীঘি রয়েছে। আরাকানিদের পরাজিত করার স্থান ‘মগধরা’ নামে পরিচিত। এই বীরযোদ্ধার কাহিনি এখনও সন্দ্বীপের মানুষের মুখে মুখে ফিরে।




