গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলায় মৌসুমে কাঁঠালের বাম্পার ফলন হলেও দাম কমে যাওয়ায় বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল পচে নষ্ট হয়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন বৈরাগিরচালা গ্রামের উদ্যোক্তা আব্দুস ছাত্তার ভূঁইয়া। পাকা কাঁঠালের রস দিয়ে তিনি তৈরি করছেন মচমচে বিস্কুট, যা ইতিমধ্যে ক্রেতাদের মন জয় করেছে। তাঁর প্রতিষ্ঠান মোমতাহিনা ফুড অ্যান্ড অয়েল মিলসে গত দুই মাস ধরে পরীক্ষামূলকভাবে এই বিস্কুট উৎপাদন চলছে। নিজের শোরুম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলায় অর্ডার অনুযায়ী পাঠানো হচ্ছে এই পণ্য। বর্তমানে প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ কেজি বিস্কুট বিক্রি হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আব্দুস ছাত্তার মূলত একজন শৌখিন ভ্রমণপিপাসু। বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সময় সেখানকার খাদ্যপ্রযুক্তি পর্যবেক্ষণ তাঁর নিত্য অভ্যাস। চীনসহ কয়েকটি দেশে কাঁঠাল থেকে তৈরি খাবার দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছেন। দেশে ফিরে সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেই গবেষণা করে এই বিস্কুট উৎপাদনের পথ খুঁজে নেন। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ফলমূল থেকে খাদ্যপণ্য তৈরি করতে দেখেছেন। আমাদের এলাকাতেও কাঁঠাল রেকর্ড পরিমাণ উৎপাদিত হয়, কিন্তু সংরক্ষণের উদ্যোগের অভাবে ফলটি নষ্ট হয়। বিদেশে দেখে আসা প্রযুক্তি ও পরামর্শ কাজে লাগিয়ে অবশেষে নিজেই এই বিস্কুট উৎপাদন শুরু করেছি। এখন এর চাহিদা দেখে উৎসাহিত হয়েছি। আপাতত পরীক্ষামূলক পর্যায়ে থাকলেও আগামী বছর কাঁঠাল দিয়ে ড্রাই কেক, রসি এবং চিপসের মতো অন্যান্য খাদ্যপণ্যও তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

বিস্কুট তৈরির প্রক্রিয়া খুব জটিল নয়। প্রথমে পাকা কাঁঠাল থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে রস সংগ্রহ করা হয়। পরে সেই রসের সঙ্গে ঘি, মাখন, দুধ, ময়দাসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ মিশিয়ে কাঁচা বিস্কুট তৈরি করা হয়। এরপর সেগুলো বড় ওভেনে ২৫ থেকে ৩০ মিনিট বেক করা হয়। বেক শেষে বিস্কুটগুলো ঠান্ডা করে প্যাকেটজাত করা হয় ভোক্তাদের কাছে পাঠানোর জন্য। কারখানার কর্মী মানিক মিয়া জানান, বিস্কুট তৈরির জন্য খুব যত্ন করে কাঁঠাল নির্বাচন করা হয়। মিষ্টতা ও জাত দেখে উপযুক্ত কাঁঠাল বেছে নেওয়া হয়। রস তৈরির প্রক্রিয়াও নিরাপদভাবে সম্পন্ন করা হয়।

ক্রেতাদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া মিলছে। মাওনা চৌরাস্তার বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম কয়েকবার এই বিস্কুট কিনেছেন। তিনি বলেন, বিস্কুটের স্বাদ মচমচে এবং কাঁঠালের ঘ্রাণ রয়েছে। তবে মিষ্টি অনেক বেশি, মিষ্টতা কিছুটা কমানো গেলে সব ধরনের ক্রেতার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে। অপরদিকে ভবানীপুর এলাকার ব্যবসায়ী মো. নাজমুল জানান, বিস্কুটের স্বাদ দারুণ হলেও এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর, সামান্য চাপেই টুকরো হয়ে যায়। ফলে সংরক্ষণে সমস্যা হয়। এক কেজির একটি বাক্সের দাম ৮৫০ টাকা, এই মূল্যও কিছুটা কমানোর পরামর্শ দেন তিনি।

পণ্যটির মান নিয়ে জানতে চাইলে গাজীপুরস্থ বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) উপপরিচালক এস এম তালাত মাহমুদ বলেন, বর্তমান বিস্কুটের মান নির্ধারণী তালিকায় কাঁঠালভিত্তিক বিস্কুট নেই। তবে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান আবেদন করলে নতুন এই পণ্যের জন্য আলাদা মান নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গাজীপুরে প্রায় ৮ হাজার ৫০২ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের চাষ হয়, যার মধ্যে শ্রীপুরেই ২ হাজার ৯৫০ হেক্টর। প্রতি বছর এই জেলায় প্রায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৫০৯ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম খান বলেন, মৌসুমে দাম কমে যাওয়ায় কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। কাঁঠাল প্রক্রিয়াজাত শিল্প গড়ে উঠলে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং অপচয়ও কমবে। চীনে কাঁঠাল রপ্তানির সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাই এই উদ্যোগে কৃষি বিভাগ সব ধরনের সহযোগিতা করবে।

গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. এমদাদুল হক মনে করেন, কাঁঠাল থেকে শুধু বিস্কুট নয়, কেক, জুস, জেলি, ক্যান্ডি এমনকি প্রোটিনসমৃদ্ধ নানা খাদ্যপণ্যও তৈরি সম্ভব। কাঁঠালের প্রতিটি অংশ পুষ্টিতে ভরপুর। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্যোক্তাদের প্রচেষ্টা একসঙ্গে হলে এই খাতে একটি নতুন শিল্প গড়ে উঠতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।