বাংলাদেশে জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মাতৃদুগ্ধে বেড়ে ওঠা শিশুর হার উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। বর্তমানে দেশের মাত্র ৫৫ শতাংশ শিশু প্রয়োজনমতো মায়ের দুধ পাচ্ছে, যেখানে ২০১৭-১৮ সালে এই হার ছিল ৬৫ শতাংশ। ২০২০ সালে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থানে থাকা বাংলাদেশ এখন নেমে এসেছে ষষ্ঠ অবস্থানে। এই তথ্য গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারি জনস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে আয়োজিত বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ ২০২৬ উপলক্ষে এক সেমিনারে উঠে আসে।

সেমিনারটির আয়োজন করে বাংলাদেশ ব্রেস্টফিডিং ফাউন্ডেশন (বিবিএফ) ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ। এতে শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, পুষ্টিবিদ, প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ ও গবেষকরা অংশ নেন। বক্তারা জানান, হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যেও অনেক শিশু জন্মের পরপরই শালদুধ বা প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ পায়নি। মায়ের দুধ টিকার মতো কাজ করে বলেও উল্লেখ করেন তারা।

অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ও বিবিএফের পরিচালক খুরশিদ জাহান বলেন, মাতৃদুগ্ধ পান কমে যাওয়া মায়ের একার ব্যর্থতা নয়। হাসপাতাল বা ক্লিনিকে সেবার ঘাটতি, অস্ত্রোপচারের পর সঠিক পরিচর্যার অভাব, এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি না পাওয়া—এসব মাতৃত্ব সুরক্ষার ঘাটতির কারণেই এই পরিস্থিতি। ২০৩০ সালের মধ্যে এই হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিবিএফের ভাইস চেয়ারপারসন অধ্যাপক সুফিয়া খাতুন তাদের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের তথ্য তুলে ধরেন। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ১২টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, ৪০টি বাজারের ২৬০টি ওষুধের দোকান এবং ৪৮টি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, আইন লঙ্ঘন করে শতভাগ দোকানে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প পণ্য প্রকাশ্যে প্রদর্শিত হচ্ছে। প্রায় ৫ শতাংশ পণ্যের নিবন্ধন নেই বা অসম্পূর্ণ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের শতভাগ ক্ষেত্রেই চিকিৎসা বা পুষ্টি পরামর্শের আড়ালে এসব পণ্যের প্রচার করা হয়। এমনকি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির টিকাকেন্দ্রেও স্যাকমোদের মাধ্যমে বিকল্প খাদ্যের প্রচার চলে।

শিশুবান্ধব হাসপাতালের অবস্থাও ভালো নয়। ১২টি হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সব কটিতে ‘শিশুবান্ধব হাসপাতাল কমিটি’ অকার্যকর বা নেই। কার্যকর ব্রেস্টফিডিং কর্নার কোথাও ছিল না। প্রায় সব হাসপাতালেই শিশুখাদ্যের প্রচার ও আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে। জবাবদিহির কোনো ব্যবস্থাও নেই।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি পরিবার–পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক জিন্নাত রেহানা বলেন, মাকে কখনোই দোষারোপ করা যাবে না; বরং সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান সামিনা আহমেদ স্কুল পাঠ্যক্রমে মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা সম্পর্কে অন্তত একটি প্যারাগ্রাফ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেন।

সেমিনারে সভাপতি বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ অধ্যাপক এস কে রায় বলেন, মাতৃদুগ্ধ পানকে টেকসই করতে চারটি স্তম্ভ মানতে হবে: কার্যকর পরিবেশ তৈরির তথ্য সরবরাহ, সহায়তা কার্যক্রমকে সক্রিয় করা, মাকে সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে সম্পৃক্ত করা এবং সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের কাজের সমন্বয়। তিনি বলেন, ‘যা মাপা যায়, তা–ই উন্নত করা যায়। নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহি জরুরি।’

বিবিএফের মহাসচিব অধ্যাপক সানিয়া তাসনিম বলেন, মায়ের দুুধ শুধু খাদ্য নয়, এটি জীবন্ত জৈবিক ব্যবস্থা যা শিশুর অন্ত্র ও রোগ প্রতিরোধক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করে। জন্মের প্রথম এক ঘণ্টায় শালদুধ খাওয়ালে নবজাতকের মৃত্যু ৩১ শতাংশ কমে। নিয়মিত মায়ের দুধ পান করা শিশুদের ডায়রিয়ায় মৃত্যুঝুঁকি ১৫ গুণ, নিউমোনিয়ায় ১১ গুণ ও অপুষ্টিতে ১৪ গুণ কমে।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সরকারের জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের উপপরিচালক রওশন জাহান আখতার, নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক নাসরিন সুলতানা এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ইফফাত আরা শামসাদ। রওশন জাহান আখতার জানান, সম্প্রতি ১৪০টি সরকারি হাসপাতালে নতুন ব্রেস্টফিডিং কর্নার স্থাপন করা হয়েছে এবং আইন মান্য হচ্ছে কি না তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

মাতৃদুগ্ধের বিকল্প শিশুখাদ্য আইন ২০১৩ ও বিধিমালা ২০১৭ থাকা সত্ত্বেও আইনের প্রয়োগ না হওয়ায় শিশু ও মায়ের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বক্তারা বলছেন, এই অবস্থা থেকে উত্তরণে সরকার, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।