ক্রোয়েশিয়ার জাগরেব শহরে একটি নির্মাণাধীন হলিউড চলচ্চিত্রের শুটিং স্পটে কাজ করার সময়ই গ্রেপ্তার হন ভলোদিমির ঝুরাভলেভ। জার্মান গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুসারে, স্কুবা ডুবুরিদের প্রশিক্ষক এই ইউক্রেনীয় নাগরিক ‘স্নেক আইল্যান্ড’ নামক একটি আসন্ন কাল্পনিক রাজনৈতিক থ্রিলার সিনেমায় পরামর্শক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। ডগ লিম্যান পরিচালিত এই ছবিতে অভিনয় করছেন অস্কারজয়ী তারকা শন পেন ও অ্যাড্রিয়েন ব্রডি। গ্রেপ্তারের ঠিক আগে একই স্থানে ঝুরাভলেভ ও ব্রডি—উভয়কেই দেখা গিয়েছিল। সিনেমাটির কাহিনি মূলত গ্যাস পাইপলাইনে বোমা হামলার ঘটনা ঘিরে গড়ে উঠেছে, যে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে ঝুরাভলেভের বিরুদ্ধেই। এই অপ্রত্যাশিত মিল যেন কোনো থ্রিলার চিত্রনাট্যের অংশ।
ঝুরাভলেভ পেশায় একজন পেশাদার স্কুবা ডুবুরি। কিছু প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি কিয়েভের একটি ডাইভিং স্কুলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জার্মানির গোপনীয়তা আইনের কারণে তাঁর পূর্ণ পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি; আদালতের কাগজপত্রে তাঁকে ‘ভ্লাদিমির জেড’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। জার্মান কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে যাওয়া নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনে বোমা হামলার ঘটনায় তিনি অন্যতম সন্দেহভাজন। তবে ঝুরাভলেভ তাঁর নিজের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন।
২০২৪ সালে ঝুরাভলেভ পোল্যান্ডে গ্রেপ্তার এড়িয়ে পালিয়ে ইউক্রেনে চলে যান। গত বছর পোল্যান্ডের একটি আদালত তাঁর বিরুদ্ধে জার্মানির জারি করা ইউরোপীয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে অস্বীকৃতি জানায়। আদালতের রায়ে বলা হয়, এই মামলায় জার্মান কর্তৃপক্ষের কোনো আইনি অধিকার নেই। পাশাপাশি নর্ড স্ট্রিম ধ্বংসের ঘটনাটিকে ইউক্রেনের আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধে একটি যৌক্তিক পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচনা করা যেতে পারে বলে আদালত মন্তব্য করে। পোল্যান্ড দীর্ঘদিন ধরেই নর্ড স্ট্রিম প্রকল্পের বিরোধিতা করে আসছিল।
ক্রোয়েশিয়ার স্থানীয় কর্তৃপক্ষের অজান্তে ঝুরাভলেভ সেখানে অবস্থান করছিলেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। শেষ পর্যন্ত তারাই তাঁকে আটক করে। জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকারি কৌঁসুলিদের ভাষ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে স্থানীয় পুলিশ বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করে। এখন তাঁর আইনজীবীরা জার্মানির হাতে প্রত্যর্পণ ঠেকানোর চেষ্টা চালাবেন। দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁর পোলিশ আইনজীবী টিমোতেউস পাপরোকি বলেন, যদি ক্রোয়েশিয়ার কোনো আদালত শুনানি করেন, তবে তা হবে এমন একটি বিষয়ে রায় দেওয়া, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের আরেক সদস্যরাষ্ট্র পোল্যান্ড ইতিমধ্যেই নিষ্পত্তি করে ফেলেছে। ক্রোয়েশিয়ার পুলায় আদালতের শুনানি শেষে পুলিশের সদস্যরা ঝুরাভলেভকে নিয়ে যান; এই দৃশ্য ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ক্যামেরাবন্দি হয়।
২০২২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রাশিয়া থেকে জার্মানিতে যাওয়া দুটি নর্ড স্ট্রিম গ্যাস পাইপলাইনে বিস্ফোরণ ঘটে। এতে নর্ড স্ট্রিম–১ এবং নর্ড স্ট্রিম–২ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয়টি তখনো চালু হয়নি। প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই পাইপলাইনের মালিকানা ছিল রাশিয়ার রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জ্বালানি প্রতিষ্ঠান গাজপ্রমের। বাল্টিক সাগরের তলদেশ দিয়ে এটি রাশিয়াকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করত। চালু হলে নর্ড স্ট্রিম–১ পথের ধারণক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে যেত। বার্লিন দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল, এটি পুরোপুরি একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প; যদিও এর সঙ্গে ভূরাজনৈতিক বিষয়ও জড়িত ছিল। ইউক্রেনকে পাশ কাটিয়ে গ্যাস প্রবাহের কারণে কিয়েভের শত শত কোটি ডলারের বার্ষিক ট্রানজিট ফি হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণ শুরু হওয়ার পর এই পাইপলাইনগুলো মস্কোর ওপর ইউরোপের জ্বালানি নির্ভরতা এবং ক্রেমলিনের রাজস্ব অর্জনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিস্ফোরণগুলো আন্তর্জাতিক জলসীমায় ঘটলেও তা ডেনমার্ক ও সুইডেনের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভেতরে পড়েছিল। কোনো দেশই কখনো এই বিস্ফোরণের দায় স্বীকার করেনি। ডেনমার্ক ও সুইডেন ২০২৪ সালে তাদের তদন্ত বন্ধ করে দিলেও জার্মানি এখনো মামলাটি তদন্ত করছে।
চলতি বছরের জুলাইয়ে জার্মানির কেন্দ্রীয় সরকারি প্রসিকিউটররা সের্হি কে নামের সাবেক এক ইউক্রেনীয় সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। প্রসিকিউটরদের দাবি, তিনি ইউক্রেনের গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের হয়ে কাজ করছিলেন। জার্মানির গ্রেপ্তারি পরোয়ানার ভিত্তিতে ২০২৫ সালের আগস্টে সের্হিকে ইতালিতে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে তাঁকে জার্মানিতে পাঠানো হয়। ইউক্রেন সরকার পাইপলাইন বিস্ফোরণে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।
প্রসিকিউটরদের বিবরণ অনুযায়ী, পেশাদার ডুবুরি, একজন নৌকার মাঝি এবং একজন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞের একটি দলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সের্হি কে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিরা ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জাল ইউক্রেনীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করে জার্মানিতে প্রবেশ করেন। এরপর ভুয়া পরিচয়পত্র দিয়ে ভাড়া নেওয়া একটি ইয়টে ওঠেন। দলটি আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে সামরিক মানের বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক ডেনমার্কের বর্নহোম দ্বীপের কাছাকাছি একটি এলাকায় নিয়ে যায়। সেগুলো বাল্টিক সাগরের তলদেশে থাকা পাইপলাইনের সঙ্গে আটকে দেওয়া হয় এবং বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য টাইম ফিউজ সেট করা হয়। ডেনমার্কের বর্নহোম দ্বীপের কাছে নর্ড স্ট্রিম–২ পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গ্যাস বের হওয়ার দৃশ্য ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২২ তারিখে ডেনিশ এফ-১৬ যুদ্ধবিমান থেকে ধরা পড়ে।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের মধ্যে ঝুরাভলেভের গ্রেপ্তার বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে, কারণ তিনি যে সিনেমার সেটে কাজ করছিলেন, সেটিই ওই বোমা হামলার কাহিনি নিয়ে তৈরি। জার্মানি এখন তাঁর প্রত্যর্পণ চাইছে, কিন্তু তাঁর আইনজীবীরা ক্রোয়েশিয়ার আদালতে পোল্যান্ডের পূর্ববর্তী রায়ের দোহাই দিয়ে তা ঠেকানোর চেষ্টা করবেন। এই মামলার পরবর্তী ধাপ ইউরোপীয় আইনি লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হতে পারে।




