বাংলাদেশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজ এখনও অসম্পূর্ণ বলে মনে করেন রাজনৈতিক কর্মী অনীক রায়। তিনি বলেছেন, অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন সম্ভব হলেও রাষ্ট্রের চরিত্র বদলানোর ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগানো যায়নি। এর ফলে প্রতিশোধের রাজনীতি ও উগ্রবাদী চিন্তার বিস্তার ঘটেছে। তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল থাকায় শূন্যস্থান পূরণে উগ্রবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

অভ্যুত্থানের সময়কার একটি ঘটনা স্মরণ করে অনীক রায় জানান, ১৯ জুলাই মালিবাগে এক বৃদ্ধ রিকশাচালক রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানাচ্ছিলেন। পুলিশের গুলির মুখে আশ্রয় নিতে বললে তিনি শান্ত কণ্ঠে বলেন, ‘গুলিতে মরলে ভালো, আর বিকাশ করতে হবে না।’ এই মন্তব্য দেশের বহু মানুষের জীবন-যন্ত্রণার প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই দিন রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রিয়জনের মরদেহ খুঁজতে গিয়ে তিনি দেখেন মর্গে জায়গা নেই, বাইরেও লাশ রাখা হয়েছে, ডাক্তাররা জ্ঞান হারাচ্ছেন—এমন ভয়াবহ দৃশ্য তাঁকে শেখ হাসিনার পতনের দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় উদ্বুদ্ধ করে।

২ আগস্টের ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচির কথাও উল্লেখ করেন অনীক রায়। তিনি বলেন, আন্দোলনকে বেগবান করতে প্রথমের শোকযাত্রার পরিবর্তে ‘দ্রোহযাত্রা’ নাম দেওয়া হয়। মিছিল বের হতেই হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় এবং পুলিশের সব বাধা পেরিয়ে শহীদ মিনারে পৌঁছায়। তখনই তিনি উপলব্ধি করেন যে শেখ হাসিনার পতন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

তবে সরকার পতনের পর রাষ্ট্র পুনর্গঠনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে সমস্যা দেখা দেয় বলে মনে করেন তিনি। দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনে প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও নির্বাচনব্যবস্থার প্রতি আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। এ সুযোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি তাৎক্ষণিক সুবিধা পেতে উদ্যত হয়। প্রতিশোধের সংস্কৃতি জন্ম নেয়, যা ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না বলে তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, ‘প্রতিশোধ সফল হয় অপরিশোধিত আবেগের মাধ্যমে, আর তা নতুন অন্যায়ের জন্ম দেয়।’

উগ্রবাদ কেবল ধর্মীয় নয়, রাজনৈতিক ও আদর্শিক রূপেও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেন অনীক রায়। সমাজকে ‘আমরা’ ও ‘ওরা’—এভাবে বিভক্ত করে ফেলে উগ্রবাদ, যা আলোচনা ও আপসের পথ সংকুচিত করে। বহুমাত্রিক বাংলাদেশের সমাজে এ বিভাজন আরও বিপজ্জনক বলে তিনি মনে করেন।

সমাধান হিসেবে তিনি সামাজিক গণতন্ত্রের পথের কথা বলেন। মুক্ত নির্বাচন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার ও কল্যাণরাষ্ট্রের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থা বাজার ও রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারে বলে তাঁর অভিমত। তিনি বলেন, ‘জুলাই আমাদের পরিবর্তনের সাহস দিয়েছে। তবে সাহসকে স্থিতিশীল রাষ্ট্রব্যবস্থায় রূপ দিতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।’

অনীক রায় শেষে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জুলাইয়ের পর মানুষের শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে কোনো রাজনৈতিক শক্তি গড়ে ওঠেনি, সেই শক্তি গড়ে তুলতে হবে। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষ শেষ পর্যন্ত জয়লাভ করবেই।