পৃথিবীর অন্যতম ভয়ংকর ও উষ্ণ স্থান হিসেবে পরিচিত সাহারা মরুভূমিতে এক বিশাল তৃণভোজী ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কৃত হয়েছে। জীবাশ্মবিদদের একটি দল ৪০ ফুট দীর্ঘ এই ডাইনোসরের হাড়গোড় খুঁজে পেয়েছেন। দিনের বেলায় এই মরুভূমিতে তাপমাত্রা ৫২ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছায়, তাই দলটি মূলত রাতের বেলায় কাজ করেছেন। চারদিকে খাঁ খাঁ বালুচর আর প্রাণঘাতী গরম—এমন প্রতিকূল পরিবেশে ২০ জন তরুণ ফসিলশিকারিকে নিয়ে এই অভিযান পরিচালনা করেছেন জীবাশ্মবিদ পল সেরেনো। পশ্চিম আফ্রিকার নাইজার দেশটির তিনটি ভিন্ন এলাকায় তিন মাস ধরে ফসিলের সন্ধান চালানো হয়। খোঁড়া ফসিলগুলো সাবধানে পরিষ্কার করে গবেষণার জন্য ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর ল্যাবে পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। গবেষণা শেষে সেগুলো আবার নাইজারে ফিরিয়ে আনা হবে, যাতে দেশটির জাদুঘরে প্রদর্শন করা যায়। এর আগেও সেরেনো এই এলাকায় এসেছিলেন এবং মরুভূমির মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা বিশাল ডাইনোসরের কঙ্কাল দেখেছিলেন, তবে তখন পর্যাপ্ত লোকবল ও সরঞ্জাম না থাকায় শুধু জায়গাগুলোর নাম টুকে রেখে ফিরে যেতে হয়েছিল। এবার আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে তারা পুরোপুরি প্রস্তত ছিলেন। পুরোনো দিনের হাতুড়ি ও ছেনির পাশাপাশি পাললিক শিলা কাটার জন্য তারা এখন শক্তিশালী ইলেকট্রিক জ্যাকহ্যামার ব্যবহার করেছেন। ‘সরোপড আইল্যান্ড’ নামে পরিচিত প্রথম গন্তব্যে পৌঁছে দলটি বিশাল এক ডাইনোসরের পাঁচটি কঙ্কাল খুঁজে পায়। লম্বা গলা ও লতাপাতা খেয়ে বাঁচা এসব সরোপড ডাইনোসরের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০ ফুট হতে পারে। নতুন এই প্রজাতিটির ডাকনাম রাখা হয়েছে ‘আইপড’। ধারণা করা হচ্ছে, আজ থেকে প্রায় ১৬ কোটি বছর আগে তারা পৃথিবীতে বিচরণ করত, যখন সাহারা ছিল সবুজে ঘেরা বনভূমি ও নদী-নালার অঞ্চল। সেখানে হাড় খুঁজে পাওয়া সহজ হলেও সময়ের সংকটই ছিল মূল চ্যালেঞ্জ। মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যে এত বড় সব হাড় খুঁড়ে বের করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে দলে সন্দেহ ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সফলতার সঙ্গে সরোপড আইল্যান্ড থেকে প্রায় ২৫ টন ফসিল নিয়ে বিদায় নেয় দলটি—একটি পূর্ণ ময়লার ট্রাকের ওজনের সমান। দ্বিতীয় গন্তব্যে যাত্রাটি ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। সাহারার ভয়ংকর গরমে ট্রাক বারবার বালুতে আটকে যেত এবং এক দিনের রাস্তা পার হতে তিন দিন লেগে যায়। তবে গন্তব্যে পৌঁছে সব কষ্ট ভুলে যান তারা। সেখানে মাটিতে থাকা আয়রনের কারণে হাড়গুলো লালচে রঙ ধারণ করেছিল। অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায় ওউরানোসরাস নামের ৩০ ফুট লম্বা একটি ডাইনোসরের পিঠের পাখনা। এই পাখনার কাজ ঠান্ডা করা নাকি অন্য কিছু, তা নিয়ে এখন গবেষণা প্রয়োজন। অভিযানের তৃতীয় ও শেষ ধাপে স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় দুর্গম এলাকায় গিয়ে মাংসাশী ডাইনোসরের চোয়ালের হাড় পাওয়া যায়, যা পরে ভয়ংকর স্পাইনোসরাসের বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। দুই সপ্তাহের এই পর্যায়ে সেখানে তারা স্পাইনোসরাসের সম্পূর্ণ নতুন একটি প্রজাতির মাথার চূড়াও আবিষ্কার করেন। তিন মাসের কঠোর পরিশ্রম শেষে দলকে উদ্দেশ্য করে সেরেনো বলেন, ‘সাহারার বুক চিরে আমরা যে আবিষ্কার করলাম, তা দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় লেখা শুরু হলো।’