বর্তমান সময়ে মুভি মানেই আর ফিল্মের রিল বা ভিডিও ক্যাসেটের মতো ভৌত মাধ্যম নয়; এখন কেবল কম্পিউটারের মাউস বা রিমোটের কয়েকটি ক্লিকেই পছন্দের দৃশ্য ভেসে ওঠে স্ক্রিনে। এত সহজলভ্য হয়ে যাওয়ায় আমরা হয়তো আর মুভিকে বস্তুগত কিছু ভাবি না। কারণ হার্ডডিস্কে অসংখ্য মুভি জমা থাকলেও ল্যাপটপের ওজনে কোনো হেরফের হয় না। কিন্তু বাস্তবে যেকোনো ভিডিও বা ছবি হলো তথ্যের সমষ্টি, আর সেসব তথ্যকে কোনো না কোনো ভৌত পরিবর্তনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হয়। পর্দার রঙিন পিক্সেলগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করেই এই দৃশ্যাবলি আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

একটি পরীক্ষামূলক প্রশ্ন থেকে এই আলোচনার সূত্রপাত: একটি মুভি যদি কাগজে জমা রাখতে চাইতাম, তাহলে কী হতো? এক্ষেত্রে ছবিকে গতিময় রাখতে তৈরি করতে হয় গতির এক ধরনের বিভ্রম। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৩০টি এ৪ সাইজের ফটোগ্রাফিক কাগজ আমাদের চোখের সামনে সরাতে হবে। নির্বাক চলচ্চিত্রের যুগে রিলগুলো চলত তুলনামূলক ধীরে, প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৬ থেকে ২৪ ফ্রেমের গতিতে। এ৪ মাপের একটি কাগজের ওজন সাধারণত ৫ গ্রামের কাছাকাছি, আর তাতে পরমাণুর সংখ্যা আনুমানিক ১০২৩ (অর্থাৎ একের পর ২৩টি শূন্য, যা প্রায় একশ বিলিয়ন ট্রিলিয়নের সমান)।

হিসাব বলছে, একটি পূর্ণাঙ্গ দুই ঘণ্টার মুভি চালাতে প্রতি সেকেন্ডে ৩০টি করে কাগজ ধরলে মোট প্রয়োজন পড়বে প্রায় ২ লাখ ১৬ হাজার কাগজ। প্রতিটি কাগজ ৫ গ্রাম ওজনের হিসেবে সব কাগজ মিলিয়ে ওজন দাঁড়াবে এক টনেরও বেশি। কেবল একটি মুভি বহন করতেই লাগবে আস্ত একটি ট্রাক। আর এই সমুদয় কাগজে থাকা পরমাণুর মোট সংখ্যা হবে প্রায় ১০২৯টি—একটি এত বিশাল অঙ্ক যা আমাদের দৈনন্দিন কল্পনাকে ছাড়িয়ে যায়।

কিন্তু হার্ডডিস্ক বা পেনড্রাইভের আধুনিক প্রযুক্তি এই সংখ্যাটিকে চোখ ধাঁধানো মাত্রায় কমিয়ে আনতে সক্ষম। এখন কম্পিউটারে শুধু সিনেমা সংরক্ষণ নয়, বরং অতি সহজে তা আদান-প্রদানও করা যায়, যেখানে ট্রাকের কোনো আবশ্যকতা থাকে না। এক টন কাগজের সমতুল্য তথ্য কীভাবে প্রায় ওজনহীনভাবে স্থানান্তরিত হয়—এটাই ডিজিটাল প্রযুক্তির যাদু। ডিজিটাল মাধ্যমে যেকোনো তথ্য সংরক্ষিত হয় বাইনারি পদ্ধতিতে, অর্থাৎ শূন্য (০) এবং একের (১) সমন্বয়ে। কম্পিউটার লেখা, গান বা মুভির তথ্যগুলোকে প্রথমে সংখ্যায় রূপান্তর করে, তারপর সেই সংখ্যাকে বাইনারি কোডে পরিণত করে। যেমন ইংরেজি বড় হাতের ‘A’ অক্ষরটি কম্পিউটারের কাছে ৬৫ সংখ্যা, যা বাইনারিতে 01000001। বাংলা ‘ক’ অক্ষরটি ২৪৫৫ সংখ্যা দিয়ে চিহ্নিত হয় এবং তার বাইনারি রূপ 100110010101।

পর্দায় প্রদর্শিত বিভিন্ন রঙও এই বাইনারি পদ্ধতিরই ফল। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে একটি নির্দিষ্ট রঙ প্রদর্শনের তথ্য স্টোরেজে জমা থাকে লাল, নীল ও সবুজের মিশ্রণ হিসেবে। স্টোরেজ সিস্টেম প্রতিটি রঙ, তার উজ্জ্বলতা ও অবস্থান নির্ণয় করে ০ এবং ১-এর বিন্যাসের মাধ্যমে। আমরা যখন মুভি দেখি, সফটওয়্যার সেই তথ্যগুলো ব্যবহার করে এবং ০ ও ১-এর অনুক্রমকে স্ক্রিনে রঙিন বিন্দুতে রূপ দেয়, যা মিলে একটি সুসংহত ছবি গঠন করে। যেমন, লাল রঙ প্রকাশ করা হয় 1111 1111 0000 0000 0000 0000 দিয়ে। সবুজের ক্ষেত্রে ১ থাকে মাঝখানে: 0000 0000 1111 1111 0000 0000। নীলের ক্ষেত্রে তা থাকে শেষে: 0000 0000 0000 0000 1111 1111। এই তিন রঙের বিভিন্ন মাত্রায় সংমিশ্রণে যেকোনো রঙ সৃষ্টি সম্ভব, যা স্ক্রিনের সংযোজক (অ্যাডিটিভ) রঙ প্রক্রিয়ার অংশ।

হার্ডডিস্ক ড্রাইভ কীভাবে এই শূন্য ও এক জমা রাখে? এর ভেতরে থাকে চৌম্বকীয় পদার্থের একটি আস্তরণ, যা অসংখ্য ক্ষুদ্র দানা দিয়ে গঠিত। প্রতিটি দানা প্রায় ১০ ন্যানোমিটার চওড়া (এক ন্যানোমিটার হলো এক মিটারের একশ কোটি ভাগের এক ভাগ)। এই কোটি কোটি চৌম্বকীয় অংশকে বৈদ্যুতিক চার্জের মাধ্যমে এক দিকে মুখ করানো হলে তাকে ধরা হয় ১, আর উল্টো দিকে মুখ করালে তাকে ধরা হয় ০। হার্ডডিস্কের রিডার ওপরের দিকে মুখ করা পেরেক-সদৃশ কণাগুলোকে ১ এবং নিচের দিকে মুখ করা কণাগুলোকে ০ হিসেবে শনাক্ত করে। এই সুবিন্যস্ত দানাগুলো ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বিটের প্রতিনিধিত্ব করে; আর ৮টি বিট মিলে গঠন করে একটি বাইট।

ধরা যাক, একটি মুভি ২ গিগাবাইট জায়গা নেয়, অর্থাৎ ২ বিলিয়ন বাইট বা ১৬ বিলিয়ন বিট। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র একটি বিট সংরক্ষণ করতে হার্ডডিস্ক ড্রাইভে প্রায় দশ লাখ পরমাণু দরকার হয়। সুতরাং ২ গিগাবাইটের একটি মুভি ড্রাইভে জমা রাখতে প্রয়োজন পড়ে প্রায় ১৬ কোয়াড্রিলিয়ন পরমাণু (অর্থাৎ ১.৬ × ১০১৬)। নিঃসন্দেহে এটি বড় অঙ্ক, কিন্তু কাগজের তুলনায় অত্যন্ত ক্ষুদ্র। তুলনা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, ল্যাবরেটরির একটি সাধারণ ড্রপার থেকে পড়া এক ফোঁটা পানিতে (প্রায় ০.০৫ মিলিলিটার) পরমাণুর সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৫ × ১০২১টি, অর্থাৎ ৫ সেক্সটিলিয়ন বা ৫ হাজার বিলিয়ন ট্রিলিয়ন! ২ গিগাবাইট মুভির জন্য প্রয়োজনীয় পরমাণুর সংখ্যা এই এক ফোঁটা পানির পরমাণুর তুলনায় এতই নগণ্য যে তা দিয়ে এক ফোঁটা পানিও গঠন করা সম্ভব নয়। ঠিক এই কারণেই কাগজে রাখতে গেলে ট্রাক প্রয়োজন হতো যে মুভি বহনে, সেটিই আপনার ল্যাপটপে প্রায় ওজনহীন অবস্থায় বিরাজ করে।

সূত্র: সায়েন্স এবিসি