২০২৪ সালের ১৬ জুলাই সকাল ১১টা ১৭ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের আকাশে একটি জ্বলন্ত গ্রহাণু প্রচণ্ড বেগে ধাবিত হতে দেখা যায়। এর ফলে সৃষ্ট সনিক বুম বা বিকট শব্দ কানেকটিকাট, রোড আইল্যান্ড ও পেনসিলভানিয়ার মতো দূরবর্তী অঞ্চলেও শোনা গিয়েছিল। প্রাথমিকভাবে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা জানিয়েছিল, আনুমানিক এক ফুট আকারের বস্তুটি বায়ুমণ্ডলের ঘর্ষণে সম্পূর্ণ পুড়ে যাওয়ার কথা, ফলে ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। কিন্তু নিউ জার্সির হিলসবোরো শহরের এক দম্পতির অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রমাণিত হয়।
ঘটনার দিন সকাল ১১টা ২০ মিনিটে ওই বাসিন্দা নিজ বাড়ির অফিসকক্ষে কর্মরত ছিলেন। আচমকা তীব্র এক শব্দে গোটা ভবন কেঁপে ওঠে। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে জানান, রান্নাঘরের ক্যাবিনেটগুলো একযোগে দেওয়াল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার মতো অনুভূতি হয়েছিল। পরিস্থিতি সামলে শোবার ঘরের দরজা খুলে তিনি বিছানার ঠিক ওপরের ছাদে একটি বড় গর্ত দেখতে পান। ঘরের মধ্যে সালফারের মতো পচা ডিমের গন্ধ ছড়িয়েছিল, সূক্ষ্ম ধূলিকণা বাতাসে ভাসছিল এবং আসবাবপত্রের গায়ে কালো গুঁড়া জমেছিল। বালিশের ওপর কুচকুচে কালো কিছু পাথরের টুকরো পড়ে থাকতে দেখা যায়।
বিজ্ঞানীদের পরবর্তী হিসাব অনুযায়ী, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পূর্বে উল্কাপিণ্ডটির ওজন ছিল প্রায় ১১৫ পাউন্ড। ঘণ্টায় ৩২ হাজার মাইল বেগে আসার সময় অধিকাংশ অংশ পুড়ে গেলেও একটি বড় খণ্ড টিকে থেকে সরাসরি ওই আবাসে আছড়ে পড়ে। দম্পতিটি পরবর্তী কয়েক সপ্তাহ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রায় তিন পাউন্ড ওজনের মহাজাগতিক পাথরের প্রতিটি টুকরো ও কণা সংগ্রহ করেন। পরে তাঁরা নমুনাগুলো বিজ্ঞানীদের কাছে হস্তান্তর করেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, পুরো ঘটনাটি তাঁরা প্রায় দুই বছর সাধারণ জনগণের আড়ালে রেখেছিলেন।
গত ৮ জুলাই বুধবার সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে প্রকাশিত গবেষণায় উঠে আসে, এটি কোনো সাধারণ উল্কাপিণ্ড নয়। এতে জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় জটিল জৈব অণু এবং লবণাক্ত পানির সুস্পষ্ট রাসায়নিক প্রমাণ মিলেছে। সেটি ইনস্টিটিউটের গ্রহবিজ্ঞানী ও গবেষণার সহলেখক পিটার জেনিসকেনসনের মতে, এই গুণাবলির কারণেই বস্তুটি ব্যতিক্রমী। গবেষকদের ধারণা, সৌরজগতের সূচনালগ্নে অনুরূপ গ্রহাণুগুলোই পৃথিবীতে প্রাণের উপকরণ বয়ে এনেছিল।
এই ধরনের সিএম কনড্রাইট শ্রেণির উল্কাপিণ্ড অত্যন্ত ভঙ্গুর প্রকৃতির হয়ে থাকে। বাতাস, আর্দ্রতা বা মাটির স্পর্শে এদের প্রকৃত রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য দ্রুত বিনষ্ট হয়। তবে হিলসবোরোর দম্পতি ঘটনাস্থলকে অপরাধস্থলের ন্যায় সুরক্ষিত রেখেছিলেন বলে নমুনাটি প্রায় আদিম অবস্থায় বিজ্ঞানীদের নিকট পৌঁছায়। গত শতাব্দীতে আবিষ্কৃত কয়েকশ সিএম কনড্রাইটের সিংহভাগই বিলম্বে উদ্ধারের কারণে পার্থিব পরিবেশে তাদের আসল গঠন হারিয়েছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিক সংগ্রহের ফলে এই নমুনার প্রাচীন রাসায়নিক গঠন অটুট রয়েছে। এতে জৈব যৌগ ও লবণাক্ত পানিজনিত খনিজ রূপান্তরের চিহ্ন স্পষ্ট। জাপানের রিউগু ও নাসার বেন্নু অভিযানের নমুনাতেও সম্প্রতি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছে, যা ইঙ্গিত দেয় এটি এমন কোনো বৃহৎ গ্রহাণুর অংশ ছিল যার অভ্যন্তরে একদা তরল পানি প্রবাহিত হতো।
বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন, প্রাথমিকভাবে এটি ১৬৩ এরিগন নামক বিশাল এক গ্রহাণুর খণ্ড ছিল। প্রায় ১৫ কোটি ৫০ লাখ বছর পূর্বের সংঘর্ষে তা ভেঙে নতুন গ্রহাণু পরিবারের সৃষ্টি হয়। পরে ৬০ লাখ বছর আগে আরেকটি সংঘাতে এই পাথরের টুকরোটি বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘ মহাজাগতিক যাত্রা শেষে আনুমানিক দুই লাখ বছর আগে পৃথিবীর অভিমুখে ধাবিত হয়। অবশেষে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এসে নিউ জার্সির বাড়ির ছাদ ভেদ করে।
ঘটনার পর দম্পতি প্রথমে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের শরণাপন্ন হলেও কোনো সহায়তা পাননি। পরে ইন্টারনেটে অনুসন্ধান চালিয়ে আমেরিকান মেটিওর সোসাইটির অপেশাদার জ্যোতির্বিজ্ঞানী মাইক হ্যাঙ্কির সন্ধান পান, যিনি নিজ ক্যামেরা নেটওয়ার্কে উল্কাপাতের দৃশ্য ধারণ করেছিলেন। হ্যাঙ্কি সব শুনে উচ্ছ্বসিত হয়ে মন্তব্য করেন, তাঁদের ছাদ ফুঁড়ে অন্তত এক লাখ ডলার মূল্যের বস্তু এসে পড়েছে এবং প্রতিটি ধূলিকণাও অমূল্য। তাঁর নির্দেশনা মেনে তাঁরা কাচের পাত্রে নমুনা সংরক্ষণ, আঠালো টেপে কণা সংগ্রহ ও নতুন ভ্যাকুয়াম ক্লিনার কেনাসহ নানা সতর্কতা অবলম্বন করেন।
আবহাওয়া রাডারের তথ্য বলছে, স্টেটেন আইল্যান্ড থেকে হিলসবোরো পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় আরও অসংখ্য ক্ষুদ্র টুকরো ছড়িয়ে পড়লেও বৃষ্টির কারণে তা নষ্ট হয়। এত ভঙ্গুর একটি উল্কাপিণ্ডের এত বড় অংশ অক্ষত অবস্থায় ভূপৃষ্ঠে পৌঁছানো একটি বিরল ঘটনা। ছাদ মেরামতের অল্প ব্যয় ছাড়া দম্পতির তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি; বরং ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগে কেনা নতুন বাড়িতে এমন মহাজাগতিক অতিথির আগমনে তাঁরা বিস্মিত।


