কথাসাহিত্যিক আহমদ ছফার মৃত্যুর পর ২৫ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর মিরপুরের সাধারণ কবরস্থান থেকে তুলে তাঁর দেহাবশেষ আনুষ্ঠানিকভাবে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হলো। ২২ জুলাই, ২০২৬ তারিখে সম্পন্ন এই প্রতীকী স্থানান্তর অনুষ্ঠানটি ২৮ জুলাই পূর্ণতা পায়, যেদিন নতুন কবর প্রস্তুত হয়। আকাশ থেকে অঝোরে বর্ষণ হচ্ছিল, তবু অগণিত ভক্ত ও অনুরাগী উপস্থিত ছিলেন এই ঐতিহাসিক ক্ষণটির সাক্ষী হতে।

মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নির্ধারিত স্থানে যখন নতুন সমাধি খোঁড়া হচ্ছিল, তখনকার পরিবেশ ছিল আবহাওয়াগত। পুরোনো কবরপাড়ের দিকে শ্রমিকেরা কোদাল চালাচ্ছিলেন। সাড়ে তিন হাত গভীর থেকে কঙ্কাল উত্তোলনের পর চিৎকার করে এক শ্রমিক জানান যে দেহাবশেষ পাওয়া গেছে। তারপর অতি সতর্কতার সাথে কফিনে স্থাপন করা হয় কনুই ও পাজরের অংশবিশেষ। শ্রাবণের বারিধারা যেন প্রকৃতির প্রতীকী অশ্রু হয়ে সিক্ত করছিল সেই দেহাবশেষ।

শোভাযাত্রা সহকারে কফিনটি পৌঁছায় চূড়ান্ত ঠিকানায়। সেখানে নতুন সমাধি অঞ্চলে ছিল বকুল ও শিউলির মতো বিভিন্ন ফুলের গাছ। বৃষ্টিভেজা বিহঙ্গগুলোও যেন সমবেত হয়েছিল। লেখকের ভক্ত মতিউর রহমান সমাধিটি দূর্বাঘাসে ঢাকা দেওয়ার পাশাপাশি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরাও করে দেন। এক ভক্ত রজনীগন্ধা নিবেদন করলেন। ছফার পরম আবেগী পংক্তি, “আমার কথা কইবে পাখি করুণ করুণ ভাষে”, যেন প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সেই দৃশ্যে।

এক সময় এই কথাসাহিত্যিককে চরম অবমাননা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে সেখানে দাফন করতে দেওয়া হয়নি। ২ সালে তাত্ত্বায়ক সরকারের আমলে মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে জায়গা না মেলায় তুরাগ নদীর তীরবর্তী সাধারণ কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত হতে হয়, এবং সেটির জন্যও ৩০ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়েছিল। সেই প্রেক্ষিতে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে, তার ভ্রাতুষ্পুত্র লেখক নুরূল আনোয়ারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে, চলতি বছরের এপ্রিলে ডিএনসিসি-র ১৪তম সভায় কবর বদলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সম্প্রতি উত্তরায় চিন্তাবিদের নামে একটি সরণির নামকরণও হয়েছে।

অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য ছাতা দিয়ে কৌতুকপূর্ণ উদ্যোগ নেন। এনাম নামের এক ভক্তের সাথে কথোপকথনে তিনি একে একটি সম্মানের দিন বলে অভিহিত করেন। এই জটিল কাজ বাস্তবায়নের নেপথ্যে তার অগ্রণী ভূমিকা ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ছিন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সিটি কর্পোরেশনের ভূমিকা। এরপরও আক্ষেপ থেকে যায় যে জার্মানির ভেৎসলারে গ্যেটের শহরে তার নামে একটি পানশালা থাকলেও নিজ পৈতৃক ভিটা চট্টগ্রামের চন্দনাইশের গাছবাড়িয়ায় কোনো স্মৃতিচিহ্ন নেই। পরিশেষে, স্মরণীর অনুরোধে মৃত্যুবার্ষিকীতে সেখানে পাঠাগার ও একাডেমি প্রতিষ্ঠার দাবি জানানো হয়।