সড়ক দুর্ঘটনায় শিক্ষার্থীদের প্রাণহানির ঘটনা থামছে না। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে মোট ৪৮ হাজার ৭১৩ জন সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ৭ হাজার ৩৬৪ জনই ছিলেন শিক্ষার্থী। এই সংখ্যা মোট নিহতের ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান বলছে, নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৪৫ দশমিক ১৯ শতাংশের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছরের মধ্যে। এই বয়সী ৩ হাজার ৩২৮ জন শিক্ষার্থী প্রধানত স্কুল ও মাদ্রাসার পড়ুয়া। অন্যদিকে, ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সী কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন ৪ হাজার ৩৬ জন, যা মোট শিক্ষার্থী মৃত্যুর ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কম বয়সী শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়া-আসা এবং বাড়ির আশপাশে খেলার সময় অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও পণ্যবাহী যানের ধাক্কায় নিহত হয়েছেন। গ্রামীণ সড়কে এই ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। অন্যদিকে, ১৩ থেকে ২৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা বাইকের চালক বা আরোহী হিসেবে আঞ্চলিক ও মহাসড়কে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন। সাইকেল আরোহীরা থ্রি-হুইলার, মোটরসাইকেল ও মালবাহী অনিরাপদ যানের ধাক্কায় গ্রামীণ ও আঞ্চলিক সড়কে নিহত হয়েছেন। এছাড়া অটোরিকশার চাকায় ওড়না বা পোশাক পেঁচিয়ে যাওয়ার মতো ব্যক্তিগত অসতর্কতার কারণেও প্রাণহানি ঘটেছে।
রেল দুর্ঘটনায়ও শিক্ষার্থীদের মৃত্যু হয়েছে। অসাবধানে রেললাইন পারাপার বা হেডফোন ব্যবহার করে রেললাইন ধরে হাঁটার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে ১ হাজার ২৩৭ জন শিক্ষার্থী প্রাণ হারিয়েছেন। গত ২৫ জুলাই ঢাকার ধামরাইয়ে বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলের তিন আরোহী নিহত হন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় গোষ্ঠী, আর যুবকেরা কর্মক্ষম গোষ্ঠী। এই দুই শ্রেণিই সড়কে বেশি মারা যাচ্ছে। এটি রোধ করতে না পারলে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে না। তিনি আরও বলেন, বক্তৃতা দিয়ে নয়, টেকসই পরিবহন কৌশল ও কঠোর বাস্তবায়নের মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। স্বার্থবাদী গোষ্ঠী দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির স্বার্থে সড়কে বিশৃঙ্খলা বজায় রাখে, যা সরকারকে উপেক্ষা করে কাজ করতে হবে।
প্রতিষ্ঠানটি সড়ক দুর্ঘটনার সাতটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ চিহ্নিত করেছে: ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও অনিরাপদ যানবাহন, সচেতনতার অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সড়ক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের অভাব, গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচারণার অভাব, শিক্ষার্থীদের বেপরোয়া বাইক চালানোর মানসিকতা, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা, এবং অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি। প্রতিকারে সুপারিশ করা হয়েছে: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বার্ষিক সড়ক নিরাপত্তা ক্যাম্পেইন, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয় অন্তর্ভুক্তি, গণমাধ্যমে জীবনমুখী প্রচারণা, অনিরাপদ যানবাহন বন্ধ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বাইক চালানো বন্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ, এবং পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধি।
প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর পরিবহনের বাসের চাপায় শহীদ রমিজউদ্দিন কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর সারা দেশে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করেছিল। আট বছর পেরিয়ে গেলেও সড়ক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই পরিকল্পনার অভাবে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সড়ক পরিবহন আইনের বাধাহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, অন্যথায় কমিটি গঠন ও সুপারিশ তৈরির মধ্যেই উদ্যোগ ঘুরপাক খাচ্ছে।




