ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ বাজারে ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কে বৃহস্পতিবার বিকেলে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পুলিশ কনস্টেবল জাহাঙ্গীর আলম (৪৩) নিহত হয়েছেন। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতে চট্টগ্রাম থেকে ফেনীর গ্রামের বাড়িতে ফেরার পথে এ দুর্ঘটনার শিকার হন তিনি।

বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার পথে নাসির উদ্দিন (২৫) নামের এক যুবক সড়কের পাশে মানুষের জটলা দেখতে পেয়ে গাড়ি থামান। আহত ব্যক্তিকে দেখতে এগিয়ে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে যান— আহত ব্যক্তি তাঁর নিজের চাচা জাহাঙ্গীর আলম। নাসির জানান, দুর্ঘটনার সময় তিনি সামনের একটি মাইক্রোবাসে ছিলেন। আশপাশের লোকজন মোবাইলে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত থাকলেও কেউ এগিয়ে আসেনি। পরে তিনি এগিয়ে এসে চাচাকে শনাক্ত করেন।

দুর্ঘটনার বিবরণে জানা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম থেকে রওনা দিয়ে দুপুর ১২টার দিকে ফেনী শহরে পৌঁছান জাহাঙ্গীর। বাজার-সদাই করে বেলা তিনটার দিকে হাসপাতাল মোড় থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে বাড়ির পথে রওনা হন। কাজিরবাগ বাজারের মজিদ মিয়ার রাইস মিলের সামনে পৌঁছালে পরশুরাম থেকে ফেনীমুখী এলজিইডির একটি পিকআপ ভ্যানের সঙ্গে অটোরিকশার সংঘর্ষ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, পিকআপটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে প্রথমে একটি যাত্রীবাহী সিএনজিচালিত অটোরিকশাকে ধাক্কা দেয়, এরপর জাহাঙ্গীরকে বহনকারী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাটিকে চাপা দেয়। সংঘর্ষে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায় এবং জাহাঙ্গীর গুরুতর আহত হয়ে সড়কে ছিটকে পড়েন। তাঁর মাথার খুলি ভেঙে যায়, বাঁ পা থেঁতলে যায় ও ডান পা ভেঙে যায়।

ভাতিজা নাসিরের অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন আহত জাহাঙ্গীরকে উদ্ধার না করে তাঁর মুঠোফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে চলে যান। পরে তাঁকে ফেনী ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বিকেল সাড়ে চারটার দিকে তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। ফেনী থেকে চট্টগ্রামের অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া সাধারণত সাড়ে তিন হাজার টাকা হলেও তাঁদের কাছ থেকে আট হাজার টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন নাসির।

চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক জানান, জাহাঙ্গীর তাঁদের থানায় কর্মরত ছিলেন। ছুটিতে বাড়ি ফেরার পথে ফেনীতে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সজল কান্তি দাস জানান, দুর্ঘটনার পর পুলিশ এলজিইডির পিকআপ ভ্যানটি জব্দ করে থানায় নিয়ে আসে। তবে চালক পালিয়ে যাওয়ায় শুক্রবার বেলা ১১টা পর্যন্ত থানায় কোনো অভিযোগ আসেনি। পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাহাঙ্গীর আলম ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ ইউনিয়নের গিল্লাবাড়িয়া গ্রামের মুন্সী হাজি বাড়ির আবদুল কাদেরের ছেলে। দুই ছেলে ও এক মেয়ের বাবা তিনি। প্রায় ৩০ বছর আগে বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরেন জাহাঙ্গীর। বোনদের বিয়ে হওয়ার পর বৃদ্ধ মাকে আগলে রেখেছিলেন তিনি। একমাত্র ছেলের মৃত্যুতে তাঁর বৃদ্ধ মা অনেকটা ভেঙে পড়েছেন।

জাহাঙ্গীরের একমাত্র মেয়ে মোবাশ্বেরা তানহা (১২) কাজিরবাগ হাজি দোস্ত মোহাম্মদ উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। কান্নাজড়িত কণ্ঠে সে জানায়, বাবা সকালে ফোন করে বাজারের লিস্ট নিয়েছিলেন। বার্ষিক পরীক্ষায় ভালো ফল করলে তাকে কক্সবাজারে বেড়াতে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাবা, কিন্তু সেই ইচ্ছা আর পূরণ হলো না। বড় ছেলে মো. আল আমিন তুহিন (১৫) জানায়, বাবা সব সময় পড়াশোনায় সহযোগিতা করতেন এবং এসএসসিতে ভালো ফল করলে কক্সবাজারে নেওয়ার কথা বলেছিলেন।

২০০১ সালে এসএসসি ও পরে এইচএসসি পাস করে ২০০৩ সালে পুলিশে যোগ দেন জাহাঙ্গীর। গত ২৩ বছর চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় কর্মরত ছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার রাত ১১টায় চট্টগ্রামের দামপাড়া পুলিশ লাইনসে প্রথম জানাজা এবং শুক্রবার সকাল ১০টায় গিল্লাবাড়িয়া জামে মসজিদ প্রাঙ্গণে দ্বিতীয় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে বাবার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়। জাহাঙ্গীর অত্যন্ত বিনয়ী ও কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন বলে জানান ফেনী মডেল থানার পরিদর্শক সাজিদ কামাল। তাঁর মৃত্যুতে খুলশী থানা-পুলিশ ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছে।