জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে দেশের আমলাতন্ত্রের চলমান সংকট ও তার সমাধানের পথ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির উদ্যোগে আয়োজিত ‘রাষ্ট্র গঠন ও আমলাতন্ত্র: দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের বাস্তবতা’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানে বক্তারা অভিমত প্রকাশ করেন, দেশের আমলাতন্ত্র বহু ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও প্রশাসনে প্রত্যাশিত গতিশীলতা দেখা যায়নি বলেও মন্তব্য করেন তারা।

গোলটেবিল বৈঠকে উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন সমস্যা ও পটভূমি তুলে ধরা হয়েছে। গভর্ন্যান্স গবেষক ইউসূফ জারিফের লেখা ওই প্রবন্ধটি উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিগত পাঁচ দশকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা উপায়ে দুর্বল করা হয়েছে এবং দুর্নীতি ও জবাবদিহিহীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য আমলাতন্ত্র অপরিহার্য উল্লেখ করে সেখানে আরও বলা হয়, একটি দুর্বল ও অপেশাদার আমলাতন্ত্র কার্যকরভাবে দুর্বল রাজনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে। এ প্রেক্ষিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার দায় রাজনীতিবিদদের পাশাপাশি আমলাতন্ত্রকেও নিতে হবে বলে মত দেন বক্তারা।

অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম বলেন, আমলাতন্ত্র পেশাদার না হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়, অর্থনৈতিক অগ্রগতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্র গঠনের এজেন্ডা ব্যাহত হয়। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার কথাও লিখিত বক্তব্যে তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারের প্রসঙ্গে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার নিয়ে এলেও কাঠামোগত পরিবর্তনে তেমন সফল হয়নি। জনপ্রশাসন নিয়ে একটি কমিশন গঠন করা হলেও তার কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। নতুন সরকারের বয়স মাত্র ছয় মাস, তবে ইতিমধ্যে আমলাতন্ত্রসহ সব পেশাজীবীকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করা হয়। বহু মেধাবী কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক কারণে ও স্পষ্ট কারণ ছাড়াই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সচিব ও সংস্থাপ্রধানের মতো উচ্চতর পদে নিয়োগগুলোও পুরোপুরি রাজনৈতিক বিবেচনায় হয়েছে বলে লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমলাতন্ত্রের ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল নয় বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক শাফিউল ইসলাম। দেশে বেকারত্ব, বিনিয়োগ মন্দা, গুণগত শিক্ষার অভাব ও সুশাসনের ঘাটতির মতো নানামাত্রিক সংকট রয়েছে। এই সংকট থেকে উত্তরণে কার্যকর ও পেশাদার আমলাতন্ত্র জরুরি। কিন্তু নতুন সরকার এসেও প্রশাসনে গতিশীলতা না আসার প্রধান কারণ হিসেবে পদায়ন ও পদোন্নতিতে রাজনৈতিক বিবেচনাকে দায়ী করেন তিনি। আমলাতন্ত্রকে পেশাদার করতে লিখিত বক্তব্যে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে পুলিশ ভেরিফিকেশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন গ্রহণ বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

বৈঠকে সাবেক সচিব আলেয়া আক্তার বলেন, পরিকল্পিতভাবে আমলাতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় আনা হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক শাহজাহান খান মনে করেন, সংস্কারের চেয়ে আমলাতন্ত্রের পুনর্নির্মাণই বেশি প্রয়োজন। সেন্টার ফর পলিসি অ্যানালাইসিস অ্যান্ড অ্যাডভোকেসির সভাপতি ও সাবেক আমলা মোহাম্মদ শরিফুল আলমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সাবেক আমলা মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম, খ ম কবিরুল ইসলাম, সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শরীফুল ইসলাম প্রমুখ।