বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ সাপ্তাহিক রোগতাত্ত্বিক প্রতিবেদনে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর একটি বিস্তৃত চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, দেশে হামে প্রাণ হারানো ৫১ শতাংশ শিশুর টিকা গ্রহণের উপযুক্ত বয়সই হয়নি। বিশ্লেষণে ৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে এবং হাম ছাড়াও ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও শ্বাসতন্ত্রের রোগের অবস্থাও তুলে ধরা হয়েছে।

শুক্রবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরে হামের উপসর্গে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৯৫ জনে, আর নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৯ জন। সব মিলিয়ে এ বছর হামে মৃত্যুর মোট সংখ্যা ৮৯৪, যা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এমনকি ৫ এপ্রিল জরুরি টিকাদান এবং ২০ মে জাতীয় ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার পরও শিশুদের শরীরে হাম প্রতিরোধের ক্ষমতা অর্জনের মাত্রা কতটুকু, তা যাচাইয়ের কোনো উদ্যোগ নেয়নি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর; সাধারণ মানুষও এ বিষয়ে কিছু জানতে পারছেন না। হামে আক্রান্ত সেই ২১ দিনের নবজাতক এখন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন বলে শুক্রবার জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

মার্চের শুরু থেকে কয়েকটি জেলায় ছড়িয়ে পড়া এই সংক্রমণ দ্রুত ৬৪ জেলায় বিস্তার লাভ করে। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আক্রান্ত ও মৃতদের বয়সভিত্তিক বিভাজন, টিকা গ্রহণের হার বা টিকা নেওয়ার পরও সংক্রমণের ঘটনা—এসব বিষয়ে কোনো বিস্তারিত পরিসংখ্যান প্রকাশ করেনি। একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আক্রান্তদের ১৮ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ছয় মাসের কম এবং ৩১ শতাংশের বয়স ছয় থেকে নয় মাসের মধ্যে। অর্থাৎ ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মৃত্যু হার ৫১ শতাংশ, যাদের কারও টিকা দেওয়ার বয়সই হয়নি। হামে মারা যাওয়া মানুষের মধ্যে ৯০ শতাংশ কোনো টিকাই পায়নি। এক ডোজ টিকা পেয়েছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, আর দুই ডোজ টিকা পাওয়ার পরও মারা গেছে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ। উল্লেখ্য, প্রথম ডোজ নয় মাসে এবং দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয়।

মৃত্যুর বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে আরও দেখা যায়, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মৃত্যু হচ্ছে ৯৪ শতাংশ। আক্রান্ত ৫৩ হাজার ২৭৯ জনের মধ্যে ৩৮ হাজার ৯৩৮ জনের তথ্য ক্যাম্পেইন শুরুর (২০ এপ্রিল) আগে এবং ১৪ হাজার ৩৪১ জনের তথ্য ক্যাম্পেইন শেষ হওয়ার (২০ মে) পর নেওয়া হয়েছে। ক্যাম্পেইনের আগে আক্রান্তদের মধ্যে ৭২ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের কম ছিল; ১৭ শতাংশের বয়স পাঁচ থেকে ১৪ বছর এবং ১১ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি। ক্যাম্পেইনের পর দেখা যায়, পাঁচ বছরের নিচের আক্রান্তের হার ৫৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের তুলনায় কম।

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে (ইপিআই) হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার সর্বনিম্ন বয়স ৯ মাস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, আক্রান্তদের ২৮ শতাংশের এবং মৃতদের ৫১ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। হামের প্রাদুর্ভাব কমিয়ে আনা বা হাম নিয়ন্ত্রণের জন্য শিশুদের টিকা নেওয়ার বয়সসীমা ৯ মাস থেকে কমিয়ে ৬ মাস করা হয়। অর্থাৎ যেসব যুক্তিতে নিয়মিত টিকাদানে সর্বনিম্ন বয়স ৯ মাস ধরা হয় এবং ক্যাম্পেইনের সময় বয়স কমিয়ে ৬ মাস করা হয়, তার কোনো কিছুই বাস্তবে পুরোপুরি কাজে আসেনি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, আক্রান্তদের ১০ শতাংশের এবং মৃতদের ২০ শতাংশের বয়স ৬ মাসের কম। যদিও এতদিন ধারণা ছিল, শিশুরা মায়ের কাছ থেকে হামের অ্যান্টিবডি পেয়ে থাকে, তাই অতি কম বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হয় না। কিন্তু বাস্তবে নবজাতকসহ নয় মাসের কম বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ও সরকারের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ মনে করেন, মায়ের শরীর থেকে শিশুর শরীরে অ্যান্টিবডি আসছে না—এর কারণ খুঁজতে গবেষণা জরুরি। তিনি বলেন, ক্যাম্পেইনের টিকার বয়সসীমা বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সীদের টিকা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় আনতে হবে। এসব সিদ্ধান্ত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে দ্রুত না নিলে দেশ গভীর সংকটে পড়তে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।