দেশের সরকারি কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রকট জনবল সংকট বিরাজ করছে। জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০-এর আলোকে ২০১৩ সালে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে আইসিটিকে বাধ্যতামূলক করা হলেও সেই অনুপাতে শিক্ষক পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। ফলে ১৩ বছর পরও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক নিজস্ব শিক্ষক নেই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০৮টি, যার মধ্যে ৬৯১টিতে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদান হয়। ২০০০ সালের আগে সরকারি হওয়া ৩৪৫টি পুরোনো কলেজের মধ্যে ৬৫টিতে এখনো আইসিটি বিষয়ের পদ সৃষ্টি হয়নি। ২০১৮ সালের বিধিমালার আওতায় সরকারি হওয়া ৩৬৩টি কলেজের মধ্যে ১০২টিতেও এই পদ নেই। যেখানে পদ রয়েছে, সেখানেও নিয়োগ প্রক্রিয়া ধীরগতির।
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবস্থা আরও নাজুক। দেশের ৭০২টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে আইসিটি শিক্ষকের একটি পৃথক পদও সৃষ্টি হয়নি। বাধ্যতামূলক হওয়ার ১৩ বছর পরও গণিত, ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞানের শিক্ষকেরা স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিয়ে বা বাধ্য হয়ে আইসিটি পড়াচ্ছেন। মাউশি সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৮৭২টি আইসিটি শিক্ষক পদ সৃষ্টির প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যার মধ্যে এক শিফটের বিদ্যালয়ে একটি ও দুই শিফটের বিদ্যালয়ে দুটি করে পদ রাখার কথা বলা হয়েছে।
প্রথমবারের মতো ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২১ সালে ১৪৫ জন আইসিটি প্রভাষক সরকারি কলেজে যোগ দেন—যা বিষয়টি বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রায় আট বছর পর। বর্তমানে তাদের মধ্যে ১৩২ জন কর্মরত। এরপর ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে আরও ১০৩ জন আইসিটি প্রভাষককে পিএসসি সুপারিশ করলেও তাদের যোগদান এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে ধারাবাহিক নিয়োগের অভাব প্রকট।
শিক্ষক সংকটের কারণে ব্যবহারিক ক্লাস নিয়মিত হয় না। শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে পরীক্ষামুখী পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। শিক্ষাবিদ ও শিক্ষকেরা বলছেন, কার্যকর আইসিটি শিক্ষা নিশ্চিত না হলে দেশের ডিজিটাল দক্ষতার ঘাটতি পূরণ কঠিন হবে। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্যমতে, বাংলাদেশের মাত্র ৫৩ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন এবং শিক্ষা, সরকারি সেবা ও আর্থিক লেনদেনে প্রযুক্তির অর্থবহ ব্যবহার এখনো সীমিত।
নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টেনে বলা যায়, ঢাকা কলেজে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণির প্রায় ২ হাজার ৪০০ শিক্ষার্থীর জন্য বিসিএস ক্যাডারের একজনও আইসিটি শিক্ষক নেই। পদার্থবিজ্ঞান ও প্রাণিবিদ্যার শিক্ষকেরা আইসিটি পড়ান। মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়েও আলাদা পদ না থাকায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ভৌতবিজ্ঞান ও গণিতের শিক্ষকেরা বিষয়টি পড়ান। নেত্রকোনা সরকারি মহিলা কলেজে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে মাত্র একজন সরকারি আইসিটি শিক্ষক রয়েছেন; বাকি ক্লাস নিচ্ছেন অতিথি শিক্ষক। নেত্রকোনা সরকারি কলেজে আড়াই হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর জন্যও একজন মাত্র আইসিটি শিক্ষক।
পদোন্নতির ক্ষেত্রেও রয়েছে জটিলতা। ৫১টি সরকারি কলেজে আইসিটি বিষয়ে প্রভাষক থেকে অধ্যাপক পর্যন্ত ২৯১টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দীর্ঘদিন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে। ফলে ৩৮তম বিসিএসের শিক্ষকেরা সহকারী অধ্যাপক পদে যোগ্যতা অর্জন করলেও পদোন্নতি পাচ্ছেন না। অথচ যোগ্য প্রার্থীর অভাব নেই; সর্বশেষ ৪৯তম বিশেষ বিসিএসে আইসিটি প্রভাষকের ২৫টি পদের বিপরীতে প্রায় ২২ হাজার ৫০০ জন আবেদন করেছিলেন।
মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল জানান, প্রয়োজনীয় পদে শিক্ষক নিয়োগের জন্য চাহিদা ও পদের হিসাব অনুযায়ী প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় তা পিএসসিতে পাঠিয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে সংকট অনেকটাই দূর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আইসিটি বই পরিমার্জন করা হলেও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক না থাকলে শ্রেণিকক্ষে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন কঠিন। তিনি দ্রুত শিক্ষক নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।




