শিক্ষার্থীদের মধ্যে এআই সরঞ্জামের ব্যবহার দিন দিন বেড়ে চলেছে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদী পরিণতি যে উদ্বেগজনক হতে পারে তা তুলে ধরেছে এক নতুন গবেষণা। অর্থনৈতিক নীতি গবেষণা কেন্দ্রের (সিইপিআর) প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে যারা দ্রুত ও নির্ভুলভাবে বাড়ির কাজ সম্পন্ন করে, তাদের শিক্ষার ভিত ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে।

গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছেন স্টকহোম বিশ্ববিদ্যালয় ও হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তারা চীনের ২৬ হাজার ৮১১ জন শিক্ষার্থীর ওপর জরিপ চালান, যারা সপ্তম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ে। প্রাথমিকভাবে দেখা যায়, যেসব শিক্ষার্থী বাড়ির কাজে এআই ব্যবহার করে তাদের হোমওয়ার্কের নম্বর ১৮ শতাংশ বাড়ে এবং কাজ শেষ করতে সময় লাগে ৩০ শতাংশ কম। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের মধ্যে তাদের মাসিক পরীক্ষার ফল ২০ শতাংশ হ্রাস পায়। আর কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় নম্বর কমে ১৮ থেকে ২৪ শতাংশ পর্যন্ত। সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দেখা যায় দুই বছর পর, যখন নম্বর সবচেয়ে নিচে নেমে আসে।

গবেষকরা দেখেছেন, যেসব শিক্ষার্থী এআইকে ‘আউটসোর্স’ করে বাড়ির কাজ করায়—অর্থাৎ এআই দিয়ে নির্ভুল উত্তর বানিয়ে নেয় কিন্তু সময় কম দেয়—তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ধারার প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় খারাপ ফল করে। গবেষণাপত্রে লেখা হয়েছে, “শিক্ষার্থীদের জন্য লক্ষ্য হলো কাজ দ্রুত শেষ করা নয়, বরং তা থেকে শেখা।” গবেষকরা আরও সতর্ক করে বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জেনারেটিভ এআই সরঞ্জামের দ্রুত বিস্তার তাদের শেখার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।”

শুধু গবেষণা নয়, বাস্তব উদাহরণও আছে। পশ্চিম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য আইনের সহযোগী অধ্যাপক জ্যাকব শেলি ফরচুনকে জানান, তার এক ক্লাসের চূড়ান্ত পরীক্ষায় শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করে প্রতারণা করেছে বলে তার দৃঢ় বিশ্বাস। বহুনির্বাচনি অংশে আট শতাংশ শিক্ষার্থী পূর্ণ নম্বর পেলেও রচনামূলক অংশে তারা হিমশিম খায় এবং পাঠ্যসূচির বাইরের উত্তর জমা দেয়। শেলি বলেন, “২০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে এমন দৃশ্য কখনো দেখিনি।” তবে তিনি শিক্ষার্থীদের দোষ দিতে নারাজ। তার মতে, বর্তমান চাকরির বাজারে এআইয়ের প্রভাবের আশঙ্কায় শিক্ষার্থীরা প্রতারণায় বাধ্য হচ্ছে।

এই বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়েছেন স্নায়ুবিজ্ঞানী জারেড কুনি হরভাথ। তিনি মার্কিন সিনেট কমিটির কাছে দেওয়া সাক্ষ্যে জানান, জেনারেশন জেড তাদের পূর্বসূরিদের তুলনায় জ্ঞানগতভাবে কম সক্ষম। হরভাথের মতে, স্বয়ংক্রিয় শিক্ষণযন্ত্রের ব্যর্থতার প্রমাণ ১০০ বছরের বেশি পুরনো। ১৯২৪ সালে ওহাইও রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক সিডনি প্রেসি ‘টিচিং মেশিন’ আবিষ্কার করেন। শিক্ষার্থীরা যন্ত্র ব্যবহার করে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেও বাস্তব জ্ঞান প্রয়োগে অক্ষম ছিল। তিন দশক পর বিখ্যাত আচরণবাদী বি.এফ. স্কিনার প্রেসির নকশার ওপর ভিত্তি করে আরও উন্নত মেশিন তৈরি করেন, কিন্তু একই ফল পান। শেষ পর্যন্ত দুজন মনোবিজ্ঞানীই প্রকল্পটি পরিত্যাগ করেন।

হরভাথ বলেন, “বিশেষজ্ঞরা যে সরঞ্জাম ব্যবহার করে তাদের জীবন সহজ করতে, শিক্ষার্থীদের শিক্ষার জন্য সেই একই সরঞ্জাম ব্যবহার করা ঠিক নয়। একজন শিক্ষানবিশ যখন বিশেষজ্ঞের সরঞ্জাম ব্যবহার করে, তখন সে দক্ষতা অর্জনের পরিবর্তে নির্ভরশীলতা শিখে।”

এআই ব্যবহারের ব্যাপকতা অবশ্য বেড়েই চলেছে। কলেজবোর্ডের এক জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৮৪ শতাংশ উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার্থী বাড়ির কাজে এআই ব্যবহার করে। কিন্তু গবেষকদের মতে, সমাজ এখনও এই সমস্যা মোকাবিলায় সঠিক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের শেখার প্রকৃত প্রক্রিয়া থেকে সরিয়ে নিচ্ছে এআই, যা শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।