বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মহাপরিচালক টেড্রোস আধানোম গেব্রিয়েসাস সতর্ক করেছেন যে, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে (DR Congo) ইবোলা ভাইরাসের বর্তমান বিস্তার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাবে পরিণত হতে পারে। তাঁর মতে, বর্তমান গতির সাথে এগোলে এই মহামারি ২০১৪-২০১৬ সালের সেই ভয়াবহ স্মৃতিকে ছাপিয়ে যাবে, যে সময়ে অন্তত ১১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছিল।
চলতি বছরের ১৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের ধারণা, ভাইরাসটি অন্তত তার তিন মাস আগেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল। বুনিয়া শহরের এক সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আফ্রিকা অঞ্চলের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জানাবি জানান, তারা ভাইরাসের পেছনে ছুটলেও ভাইরাসটি তাদের চেয়ে দ্রুত এগিয়ে চলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই এই সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তবে শুরুতে একে ম্যালেরিয়া বা টাইফয়েড বলে ভুল করা হয়েছিল। ফলে রোগ শনাক্তকরণে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এই প্রাদুর্ভাবে এখন পর্যন্ত অন্তত ৪,৩০০ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং ২ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বিশেষ করে এই স্ট্রেইনটি ইবোলা ভাইরাসের অত্যন্ত বিরল 'বান্ডিবুগয়ো' (Bundibugyo) প্রজাতির, যা এর আগে মাত্র দুবার (২০০৭ ও ২০১২ সালে) দেখা গিয়েছিল। বর্তমানে এই নির্দিষ্ট প্রজাতির ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কোনো অনুমোদিত ভ্যাকসিন বা স্বীকৃত চিকিৎসাপদ্ধতি নেই। এছাড়া কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলে চলমান আঞ্চলিক অস্থিরতা ও সংঘাত স্বাস্থ্যকর্মীদের কাজে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জানাবির মতে, প্রতিকূল পরিবেশের কারণে বর্তমানে মোট আক্রান্তদের মাত্র ৩০ শতাংশের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাচ্ছে।
ইবোলা একটি বিরল কিন্তু মারাত্মক ভাইরাস। সংক্রমণের ২ থেকে ২১ দিনের মধ্যে এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায়। শুরুর দিকে জ্বর, মাথাব্যথা এবং ক্লান্তির মতো সাধারণ ফ্লু বা ম্যালেরিয়ার লক্ষণ দেখা দিলেও পরবর্তীতে বমি ও ডায়রিয়া শুরু হয়, যা শেষ পর্যন্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অকেজো হওয়ার দিকে নিয়ে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা বমির মতো শারীরিক তরলের সংস্পর্শে এলে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
তবে আশার কথা হলো, যুক্তরাজ্যের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা MHRA বান্ডিবুগয়ো প্রজাতির ভ্যাকসিনের প্রথম মানব পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি দল কোভিড ভ্যাকসিনের একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই টিকা তৈরি করছে। এছাড়া আরও তিনটি দল আলাদাভাবে ভ্যাকসিন তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও সেগুলো এখনও ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে প্রবেশ করেনি। পাশাপাশি, প্রচলিত দুটি অ্যান্টিভাইরাল থেরাপি জীবন রক্ষায় কতটা কার্যকর হতে পারে, তা যাচাই করতে ডিআর কঙ্গোতে একটি পৃথক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পৃষ্ঠপোষকতা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আশা করছে আগামী তিন মাসের মধ্যে সংক্রমণের গতি কমিয়ে আনা সম্ভব হবে, তবে তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে এটি পুরোপুরি মহামারি শেষ করা নয়, বরং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করার একটি প্রচেষ্টা মাত্র। এই সংকটের মাঝে এড হান্ট নামের একজন ব্রিটিশ স্বাস্থ্যকর্মী স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ঝুঁকিতে পড়লে তাকে সরিয়ে যুক্তরাজ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে।




