দেশের প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করতে একটি বিস্তৃত সংস্কার প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন ফয়সাল হাবিব নামের এক প্রভাষক। বাঞ্ছারামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের এই শিক্ষক তার বিশ্লেষণে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করে ১৮টি নির্দিষ্ট সুপারিশ সরকারের কাছে পেশ করেছেন।

তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমানে বাংলাদেশে ১ লাখ ১৮ হাজার ৬০৭টিরও বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ২ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী শিক্ষা গ্রহণ করছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৫ হাজার ৫৬৯টি, যেখানে শিক্ষার্থী ১ কোটি ৬ লাখের বেশি। অন্যদিকে বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৯৫ লাখ ৬৫ হাজার ছাড়িয়েছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা ছাত্রদের চেয়ে বেশি, যা লিঙ্গসমতার দিকে ইতিবাচক ধারা নির্দেশ করছে। এসব বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের সংখ্যা ৭ লাখ ৭ হাজারেরও বেশি, তবে প্রভাষক হাবিব মনে করেন, শিক্ষক–শিক্ষার্থীর অনুপাত ও অন্যান্য সীমাবদ্ধতা শিক্ষার গুণগত মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

তার মতে, প্রাথমিক স্তরই শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের মূল ভিত্তি এবং জাতীয় অগ্রযাত্রার চালিকা শক্তি। সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত বাধ্যতামূলক শিক্ষার আলোকে তিনি জোর দিয়ে বলেন, শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি গুণগত মান নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকের সংকট, প্রশাসনিক জনবলের অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি অতিরিক্ত অশিক্ষামূলক দায়িত্ব শিক্ষাদানের পরিবেশকে প্রতিনিয়ত প্রভাবিত করছে।

এই বাস্তবতায় তার প্রথম কয়েকটি সুপারিশ প্রশাসনিক জনবল কাঠামো ঢেলে সাজানোর ওপর জোর দেয়। তিনি প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একজন ক্লার্ক, একজন অফিস সহায়ক এবং একজন স্থায়ী পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের প্রস্তাব করেন, যাতে শিক্ষকেরা পাঠদানে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ গতিশীল করতে পিয়ন এবং রাতের বেলা ভবন ও সরঞ্জামের নিরাপত্তায় নৈশ প্রহরী নিয়োগের কথাও বলেছেন তিনি।

অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে প্রতিটি বিদ্যালয়ে লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, স্টোররুম, শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কমনরুম, মাল্টিমিডিয়া রুম এবং পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষসহ ন্যূনতম ১২টি কক্ষবিশিষ্ট আধুনিক ভবন নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন প্রভাষক হাবিব। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে কমপক্ষে ১৪ জন যোগ্য ও মেধাবী শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও তার প্রস্তাবনায় স্থান পেয়েছে।

শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়ন ও মর্যাদা বৃদ্ধির প্রশ্নেও তিনি বেশ কিছু সুপারিশ করেন। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক মানের ও যুগোপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যেন শিক্ষকেরা আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি ও প্রযুক্তি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে পারেন। কর্তব্যে অবহেলার বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নিষ্ঠাবান ও দক্ষ শিক্ষকদের যথাযথ স্বীকৃতি ও পুরস্কার প্রদানের কথাও বলেছেন তিনি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর একটি হলো শিক্ষকদের ভোটার তালিকা, জনশুমারি ও নির্বাচনের মতো অশিক্ষামূলক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে তাদের সম্পূর্ণ কর্মঘণ্টা শিক্ষার্থীদের জন্য নিশ্চিত করা। পাশাপাশি ধাপে ধাপে শিক্ষকদের প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তার মর্যাদা দেওয়ার নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি।

প্রযুক্তিগত উন্নয়নে প্রতিটি বিদ্যালয়ে আধুনিক আইসিটি ল্যাব, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ ও একজন দক্ষ কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগের প্রস্তাব রাখেন ফয়সাল হাবিব। শিক্ষার্থীদের সার্বিক বিকাশে একজন খেলার শিক্ষক ও প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ এবং আর্থিক স্বচ্ছতার জন্য প্রতি ক্লাস্টারে একজন পেশাদার হিসাবরক্ষক নিয়োগেরও দাবি জানান। দুর্গম এলাকার শিক্ষকদের জন্য সরকারি আবাসন, বিশেষ যাতায়াত ভাতা ও প্রণোদনার সুপারিশও তার প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত।

শিক্ষকদের যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে দ্রুত পদোন্নতি ও উচ্চতর বেতন স্কেলের একটি স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলেছেন এই প্রভাষক। একইসঙ্গে প্রতিটি বিদ্যালয়ে বিশুদ্ধ পানি, আধুনিক ওয়াশ ব্লক, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপনের ওপরও জোর দিয়েছেন।

তার সর্বশেষ সুপারিশটি শিক্ষার্থীদের পুষ্টি ও উপস্থিতি নিশ্চিতকরণকে কেন্দ্র করে। তিনি প্রাক্-প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থীর জন্য শতভাগ বিনা মূল্যে মানসম্মত ও পুষ্টিকর মধ্যাহ্নভোজ কর্মসূচি চালু করার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে অপুষ্টি হ্রাস পায়, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ে এবং শেখার পরিবেশ আরও উন্নত হয়।

লেখক তার দৃঢ় বিশ্বাস ব্যক্ত করে বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের এই মৌলিক চাহিদাগুলো পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়ন করে প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনকে ঢেলে সাজানো গেলে মানোন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। এর সুফল শুধু বর্তমান প্রজন্মই নয়, আগামী কয়েক দশক ধরে সমগ্র জাতি ভোগ করবে, কারণ আজকের সুশিক্ষিত শিশুই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রধান চালিকা শক্তি।