মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার একটি বিদ্যালয়ের মাঠে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা পানি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোহর শেখ একটি মন্তব্য করেন, 'বোকার জমি জলে ডোবে'। এটি ছিল একসময়ের কৃষি বিভাগের প্রচারিত 'বোকার ফসল পোকায় খায়' স্লোগানের অনুকরণে বলা। মোহর শেখ পূর্বে সরকারি কাজে পানির লাইন স্থাপন ও মেরামতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি দেবীপুর ডি জে এম সি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে সামান্য বৃষ্টিতেই সৃষ্ট জলাবদ্ধতার প্রসঙ্গে এই কথা বলেন। এই জলাবদ্ধতার কারণে বিদ্যালয়ের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যায়।

শুধু এই একটি বিদ্যালয় নয়, সারাদেশের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান একই সমস্যায় জর্জরিত। উন্নয়নকর্মী হাফিজুল ইসলাম সুনামগঞ্জ সফর শেষে জানান, বর্ষার আগেই সেখানকার অনেক বিদ্যালয়ের মাঠে পানি জমে থাকতে দেখা গেছে। ফরিদপুর সদরের গোয়ালচামট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও পানি নিষ্কাশনের পথ না থাকায় একই দশা। শেরপুরের ঝিনাইগাতী সরকারি মডেল পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠও থই থই পানিতে নিমজ্জিত। ১৯৬১ সালে প্রতিষ্ঠিত ও ২০১৮ সালে সরকারিকরণ করা এই বিদ্যালয়টির পাশের বাজার সড়ক এতটাই উঁচু যে মাঠটি সড়কের চেয়ে প্রায় দুই ফুট নিচে নেমে গেছে। চারপাশে নতুন ভবন নির্মাণের ফলে পানি নিষ্কাশনের পুরোনো ব্যবস্থাও ধ্বংস হয়ে গেছে। ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের খারুয়া বড়াইল উচ্চবিদ্যালয় ও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও তথৈবচ। সেখানে বিদ্যালয়ের মাঠে হাঁসের ঝাঁক সাঁতার কাটার দৃশ্য এখন নিত্যদিনের ঘটনা।

স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা বিষয়টি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন। গাংনীর ইউএনও আনোয়ার হোসেন সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের কথা বলেছেন। মেহেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. নাজমুল হুদা প্রয়োজনীয় বরাদ্দ পেলে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। ঝিনাইগাতী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানোর কথা বলেছেন। তবে এসব বক্তব্যকে দায়সারা মনে হচ্ছে। যেন বরাদ্দের টাকাই একমাত্র সমাধান। অথচ, বিদ্যালয়ের পাশের সড়ক ক্রমশ উঁচু হয়ে বিদ্যালয়কে গর্তে ফেলে দেওয়ার ঘটনা এক দিনে ঘটেনি। রাস্তা নির্মাতারা বিদ্যালয়ের কথা ভাবেননি।

এই প্রেক্ষাপটে ব্যয়বহুল প্রকল্প ছাড়াই সমাধানের সহজ পথের সন্ধান দিয়েছেন মোহর শেখ। তিনি জানান, বৃষ্টির পানি দ্রুত মাটির নিচে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করাই আসল কাজ। এতে জলাবদ্ধতা যেমন হ্রাস পাবে, তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও পুনর্ভরণ হবে। তিনি দুটি সহজ পদ্ধতির কথা উল্লেখ করেন। প্রথমটি হলো 'রিচার্জ কূপ', যা ছোটখাটো কুয়ার মতো গর্ত করে ঝামা ইট দিয়ে ভরাট করার কৌশল। এর মাধ্যমে পানি পরিশোধিত হয়ে সরাসরি গভীর ভূস্তরে চলে যাবে। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো 'পারকোলেশন পিট'। এটি ইটের খোয়া, পাথর ও বালু ভরা ছোট গর্ত, যেখানে পানি ধীরে ধীরে মাটির ভেতরে প্রবেশ করে। এর নির্মাণ খরচ খুবই কম এবং স্কুল বা ছোট ক্যাম্পাসের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।

গর্ত করতে অনাগ্রহী হলে 'ইনফিলট্রেশন ট্রেঞ্চ' নামক আরেকটি বিকল্পের কথাও জানান মোহর শেখ। এটি পাথর ও নুড়ি ভরা লম্বা সরু নালা, যা বড় মাঠের জন্য কার্যকর। পাশাপাশি, তিনি বিদ্যালয় ভবনের ছাদের পানিও পাইপের মাধ্যমে সংগ্রহ করে এসব পিট বা কূপে পাঠানোর পরামর্শ দেন। মোহর শেখ বিদ্যালয়ের মাঠে পড়ে থাকা পরিত্যক্ত ইট-খোয়ার স্তূপ দেখিয়ে মন্তব্য করেন, এসব দিয়েও স্বল্প খরচে একটি প্রকৃতিবান্ধব ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

স্থপতি ও পরিবেশকর্মী ইকবাল হাবিব দূর দেশ থেকে ফোনে এই পরিস্থিতির সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, বাংলাদেশে মোহর শেখের মতো মানুষের অভাব নেই। তিনি জোর দিয়ে বলেন, দেশে ফিরেই প্রকৃতিনির্ভর সমাধানগুলো জনপ্রিয় করার কাজে নেমে পড়তে হবে এবং জলাবদ্ধতামুক্ত স্কুল নির্মাণের মাধ্যমেই এর সূচনা হোক।