দেশের ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার এক ধরনের নীরব পরিবর্তনের সাক্ষ্য বহন করছে। বিশেষত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সিটি ব্যাংক ও দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস প্রদানকারী বিকাশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জামানত ছাড়াই ন্যানো ঋণ বিতরণ এবং স্বয়ংক্রিয় কিস্তি পরিশোধের ব্যবস্থা চালু হয়েছে। স্মার্টফোনের সাহায্যে মুহূর্তেই ঋণের সুবিধা পাওয়া এবং তা পরিশোধ করতে পারার এই পদ্ধতি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে আরও সরল করে তুলেছে। তবু ব্যাংক খাত যেখানে প্রযুক্তির দ্রুতগামী সড়কে এগিয়ে চলেছে, সেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করা ক্ষুদ্রঋণ খাত এখনো অন্ধকারেই রয়ে গেছে। এর নেপথ্যে রয়েছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির নীতিনির্ধারণী জড়তা, প্রযুক্তিগত অনাগ্রহ এবং পুরোনো আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা।
জাতীয় অর্থনীতি যখন ‘স্মার্ট গভর্নেন্স’ ও নগদবিহীন ব্যবস্থার পথে অগ্রসর হচ্ছে, ঠিক তখন এমআরএর ডিজিটাল ঋণনীতি প্রণয়নে দীর্ঘসূত্রতা সমগ্র খাতকে পিছিয়ে দিচ্ছে। অথচ সিটি-বিকাশের সমন্বিত রূপরেখা ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর জন্য একটি আদর্শ নকশা হিসেবে কাজ করতে পারে। এই মডেল অনুসরণ করলে এমএফএস ওয়ালেটের মাধ্যমে ডিজিটাল ঋণ চালু হওয়ায় মাঠপর্যায়ে ঘরে ঘরে গিয়ে কাগজের ফরম পূরণ এবং নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি ও ব্যয় পুরোপুরি দূর হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ই-কেওয়াইসি ব্যবস্থার মাধ্যমে গ্রাহকের ওয়ালেট লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদমভিত্তিক তাৎক্ষণিক ঋণ মূল্যায়ন সম্ভব হবে। এর ফলে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নামিয়ে আনা যাবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ে গ্রাহকের ওয়ালেট থেকে ঋণের টাকা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলোর জনবল ও পরিচালন ব্যয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পাবে। এই সাশ্রয়ের সরাসরি সুফল পাবে প্রান্তিক গ্রাহকেরা—কম সুদের হারের রূপে।
প্রান্তিক জীবনের বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখা যায়, একজন গ্রামীণ সবজি বিক্রেতা অথবা ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তার জরুরি প্রয়োজনে পাঁচ হাজার টাকার মূলধন প্রয়োজন হতে পারে। প্রচলিত ব্যবস্থায় তাঁকে ঋণের আবেদনপত্র কিনে কার্যালয়ে যেতে হয়, কাগজে সই বা টিপসই দিতে হয় এবং অনুমোদনের জন্য কয়েক দিন অপেক্ষা করতে হয়। এরপর প্রতি সপ্তাহে মাঠকর্মীর হাতে নগদ কিস্তি শোধ করতে হয়, যা উভয় পক্ষের জন্যই সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু সিটি-বিকাশ মডেলের মতো ডিজিটাল পদ্ধতি থাকলে ওই উদ্যোক্তা মধ্যরাতেও তাঁর মোবাইল ওয়ালেট ব্যবহার করে কয়েক সেকেন্ডে সরাসরি ঋণ পেয়ে যাবেন। উপার্জিত আয়ের অংশ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কিস্তির অর্থ কেটে নেওয়া হবে। ফলে কাজের সময় নষ্ট হবে না, আবার মাঠকর্মীদেরও নগদ বহনের ভয় থাকবে না।
এমআরএর নীতিগত স্থবিরতার কারণে দেশের ক্ষুদ্র ঋণদানকারী সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ফিনটেক তহবিলের বিশাল সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের শীর্ষ ৫০টি বৃহৎ ক্ষুদ্রঋণ সংস্থা বিভিন্ন উৎস থেকে সহজে অর্থায়ন পেলেও ছোট ছোট সংস্থাগুলো ব্যাংক বা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় তহবিলের অভাব এবং আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা না থাকায় ছোট এনজিওগুলো দেউলিয়া হওয়ার এবং বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। এটি তৃণমূল অর্থনীতিতে বৈষম্য ও শূন্যতা সৃষ্টি করছে। তবু এই বৈষম্য দূর করতে এমআরএর পক্ষ থেকে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না।
একটি সফল প্রযুক্তিগত মডেল চোখের সামনে থাকা সত্ত্বেও অভিভাবক সংস্থা হিসেবে এমআরএ এখনো চিরাচরিত ফাইল, রেজিস্টার খাতা ও অ্যানালগ অডিটের ওপর নির্ভরশীল। এমএফএস ওয়ালেটের মাধ্যমে ঋণ বিতরণ ও স্বয়ংক্রিয় আদায়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় মাঝারি ও ছোট এনজিওগুলো আইনি জটিলতার আশঙ্কায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল কার্যক্রমে অগ্রসর হতে পারছে না। খাতকে রক্ষা করতে এবং কোটি কোটি প্রান্তিক মানুষকে আধুনিক সুবিধার আওতায় আনতে এমআরএকে দ্রুত নীতিগত পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রথমত, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সরাসরি হস্তক্ষেপে অবিলম্বে এমএফএস ওয়ালেটের মাধ্যমে সম্পূর্ণ ডিজিটাল উপায়ে ঋণ বিতরণ ও আদায়ের ঋণনীতি জারি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় পরিচয়পত্র ও বায়োমেট্রিক ডেটাবেজের সঙ্গে সমন্বয় করে ডিজিটাল সিআইবি এবং ই-কেওয়াইসি নির্দেশিকা চালু করা প্রয়োজন। স্মার্ট বাংলাদেশের স্বার্থে এমআরএকে কাগজের খুঁটি আঁকড়ে থাকার সংস্কৃতি ত্যাগ করে আধুনিক, ডিজিটাল ও দূরদর্শী নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।
লেখক: ডিএফএস ও সিবিএস বিশেষজ্ঞ




