দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল নরসিংদীতে গ্যাসের তীব্র সংকটে শতাধিক কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে পড়েছে। এর ফলে শ্রমিকদের কাজ বন্ধ রেখে বসে থাকতে হচ্ছে এবং শিল্পমালিকরা চরম ভোগান্তির মধ্যে পড়েছেন। জেলার বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চুলা জ্বলছে না, আর সিএনজি পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।

নরসিংদী শহর এবং এর আশপাশের এলাকায় যে কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ রয়েছে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে চিশতিয়া সাইজিং মিল, ইয়ামিন সাইজিং মিল, মমিন সাইজিং মিল, হোসেন ডাইং অ্যান্ড ক্যালেন্ডারিং মিল, আবেদ টেক্সটাইল মিলস, শিল্পী ডাইং, নদী-বাংলা সাইজিং মিল, ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস, আনোয়ার প্রিন্টেক্স, রংধনু সাইজিং মিল, এন আহমেদ ডাইং ও নাসির ডাইং। এছাড়াও মাধবদীর আমানত শাহ গ্রুপ ও পাকিজা গ্রুপের একাধিক কারখানা, এম এম কে ডাইং, মুক্তাদিন ডাইং, মাধবদী ডাইং, মুক্তা ডাইং এবং সখিনা ডাইংসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।

শিল্পমালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই সংকট শুরুর আগেও নরসিংদীতে গ্যাসের চাপ ছিল বেশ কম। তখন কম চাপে পালা করে তারা কোনোভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের চাপ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে এবং প্রায়ই তা শূন্যে নেমে আসছে। গত এক মাস ধরে অল্প গ্যাসের চাপে ও বিকল্প পদ্ধতিতে অন্তত ১০ শতাংশ উৎপাদন সম্ভব হলেও, গত কয়েক দিনে তা সম্পূর্ণ শূন্যে নেমে এসেছে। কবে নাগাদ এই সংকটের সমাধান হবে তা নিয়ে উদ্যোক্তারা অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।

জানা গেছে, দেশের স্থানীয় কাপড়ের চাহিদার প্রায় ৭০ শতাংশই নরসিংদী জেলা সরবরাহ করে থাকে। এই জেলায় মোট তিন হাজারেরও বেশি টেক্সটাইল, ডাইং ও স্পিনিং মিল রয়েছে। সংকট নিয়ে ১০ জন শিল্পমালিকের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত বছরগুলোতে একের পর এক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগ সামলে ব্যবসায়ীরা যখন ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন, তখনই এই জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। শিল্পমালিকদের মতে, জ্বালানি সংকটের কারণে নরসিংদীতে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।

স্বাভাবিক সময়ে শিল্পকারখানাগুলোতে ১৫ পিএসআই গ্যাস পাওয়ার কথা থাকলেও, এখন তা দুই থেকে চার পিএসআইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ। গত কয়েকদিন ধরে তা শূন্যের পর্যায়ে চলে এসেছে। নরসিংদী টেক্সটাইল, ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও মাধবদী ডাইং ফিনিশিং মিলসের মালিক নিজাম উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, দেশের ৭০ ভাগ কাপড়ের চাহিদা মেটানো নরসিংদীতে এই সংকটের কারণে অনেক মিল-কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকদের বেতন বা গ্যাস বিল — কোনো কিছুই দিতে পারবেন না শিল্পমালিকেরা।

সংকটের কারণ হিসেবে নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি রাশিদুল হাসান ঘোড়াশাল পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যাওয়াকে দায়ী করেছেন। তিনি জানান, গ্যাসনির্ভর এই সার কারখানাটি আগে ৫০ শতাংশ সক্ষমতায় চলছিল। এখন আমদানি কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে এটি পূর্ণশক্তিতে চালানো হচ্ছে। ফলে কলকারখানার জন্য নির্ধারিত গ্যাস সার কারখানায় চলে যাওয়ায় স্থানীয় শিল্প উদ্যোক্তারা গ্যাস পাচ্ছেন না।

গ্যাস সংকটের দ্রুত সমাধানের তাগিদ দিয়ে ভূঁইয়া টেক্সটাইল অ্যান্ড ক্যালেন্ডার মিলস লিমিটেডের পরিচালক আনিসুর রহমান ভূঁইয়া প্রশ্ন তুলেছেন, সরকারের উচিত জানানো যে এই সংকট কবে নাগাদ নিরসন হবে এবং সেই সময় পর্যন্ত তাদের করণীয় কী। অন্যদিকে, গত ২০ দিন ধরে উৎপাদন বন্ধ থাকা আবেদ টেক্সটাইল মিলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, উৎপাদনহীন কারখানায় শ্রমিকরা অলস সময় কাটাচ্ছেন। অসন্তোষ এড়াতে তাদের দিয়ে যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে নরসিংদীতে তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের ম্যানেজার মাকসুদ রহমান জানান, এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে নরসিংদীসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। এর ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানা, বাসাবাড়ি ও পরিবহন খাতে গ্যাসের সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি জানান, দ্রুত এই সংকট নিরসনের চেষ্টা চলছে।