নদীর মোহনার কাদায় লুকিয়ে থাকা একটি বিশেষ মাছের নাম ইন্দুর বাইলা। এর গায়ের রং কাদার সঙ্গে মিশে যাওয়ায় সহজে চোখে পড়ে না। মাথা চ্যাপ্টা, চোখ ছোট, আর মুখের গঠন দেখলে যে কারও ইঁদুরের কথা মনে পড়বে। জেলেরা বলেন, জাল থেকে হাতে নিলেই বোঝা যায় কেন এমন নাম—মুখ সামনের দিকে সরু, ঠিক ইঁদুরের নাকের মতো। বরিশাল, ভোলা বা পটুয়াখালীর বাজারে এটি তুলার ডান্ডি নামেও পরিচিত। স্থানীয়রা দুটো নামই ব্যবহার করেন—কেউ বলেন ইন্দুর বাইলা, কেউ শুধু ডান্ডি মাছ। এলাকাভেদে ডাটি বা ডাডি নামেও ডাকা হয়, যা মুখে মুখে বছরের পর বছর ধরে পরিবর্তিত হয়েছে। এটি একধরনের বাইলা বা বেলে মাছ হিসেবে পরিচিত, তবে এখানে একটি পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত পরিচিত বেলে মাছ Glossogobius giuris (গ্লসোগোবিয়াস জিউরিস) এলিওট্রিডি পরিবারের হলেও ইন্দুর বাইলা সিলাজিনিডি পরিবারের সদস্য। এর বৈজ্ঞানিক নাম Sillaginopsis panijus (সিলাজিনপসিস প্যানিজাস)। দেখতে ও স্বভাবে কাছাকাছি হলেও বংশগতভাবে দুটি ভিন্ন মাছ। বাজারে অবশ্য এত বিচার না করে তলায় শুয়ে থাকা কাদাপ্রিয় মাছকেই বাইলা বলা হয়।
এই মাছের নামকরণের ইতিহাস ১৮২২ সালে শুরু, যখন ফ্রান্সিস বুকানন-হ্যামিল্টন গঙ্গা নদীর মোহনা থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। সেই গঙ্গার প্রভাবে এর ইংরেজি নাম হয়েছে Gangetic whiting (গ্যানজেটিক হোয়াইটিং)। মাথার চ্যাপ্টা গড়নের কারণে পরবর্তীতে Flathead Sillago (ফ্ল্যাটহেড সিলাগো) নাম চালু হয়। ১৮৬১ সালে গিল নামের এক বিজ্ঞানী লক্ষ করেন, এই মাছের মাথার গঠন পরিবারের অন্যদের থেকে আলাদা। তাই তিনি একটি নতুন গণ তৈরি করেন—Sillaginopsis। আজও এই গণে শুধু একটি মাছই রয়েছে; প্রায় ২০০ বছরেও কোনো নতুন সদস্য যোগ হয়নি।
শারীরিকভাবে ইন্দুর বাইলার চোখ হাড়ের মধ্যে বসানো, যা দেখে মনে হয় ঢাকা। কাদাটে পানিতে চোখের কাজ কম থাকায় যুগে যুগে চোখ ছোট হয়ে এসেছে। শরীর লম্বাটে ও নলের মতো গোলাকার। আঁশ মিহি এবং হাতে নিলে পিছলে যায়। পিঠের প্রথম পাখনায় ১০টি কাঁটা থাকে, যার একটি বেশ লম্বা ও পেছনের দিকে বাঁকানো। দ্বিতীয় পাখনায় থাকে ২৫ থেকে ২৭টি নরম রশ্মি। মাছবিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবারের সব আত্মীয়ের মধ্যে চেহারায় সবচেয়ে আলাদা মাছ এটি, দূর থেকেও সহজে চেনা যায়।
আবাসস্থল হিসেবে নদীর মোহনা পছন্দ করে, যেখানে মিষ্টি ও লোনাপানি মিশে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার কিছু অংশে পাওয়া যায়। গবেষকদের ধারণা, মেঘনার মোহনায় বিশ্বের অন্য যেকোনো স্থানের তুলনায় এই মাছের সংখ্যা বেশি। দক্ষিণের মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও বলেশ্বর নদী এই মাছের জন্য বিশেষ আবাস। আকারে খুব বড় নয়—সর্বোচ্চ ৪৪ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। স্ত্রী মাছ ১৮-১৯ সেন্টিমিটার লম্বা হলেই প্রজননক্ষম হয়। মেঘনায় এক গবেষণায় ধরা পড়া মাছের মধ্যে স্ত্রী মাছের সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে, এবং স্ত্রী মাছের ওজন বাড়ার হারও বেশি। হুগলি নদীর মোহনায় এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা মাছের কানের ভেতরের ছোট হাড়ের পরত গুনে বয়স নির্ণয় করেছিলেন, যেমন গাছের বয়স গুঁড়ির স্তর দেখে বোঝা যায়।
জেলেদের ভাষ্যমতে, বর্ষাকাল ও শীতের শুরুতে জালে বেশি ধরা পড়ে। দক্ষিণ উপকূলের বাজারে এর চাহিদা ভালো। ভুনা করে খাওয়াই স্থানীয়ভাবে বেশি প্রচলিত। কাঁটা কম ও মাংস নরম হওয়ায় রান্না সহজ। বিদেশে এর তেমন পরিচিতি নেই এবং রপ্তানি বাজার ছোট। ছোট আকারের ইন্দুর বাইলা কখনো কখনো অ্যাকুয়ারিয়ামের মাছ হিসেবে বিক্রি হয়, যদিও বাংলাদেশে এই রীতি এখনও গড়ে ওঠেনি। বিদেশের কোনো কোনো দেশে শখের মাছ হিসেবে এর কদর কিছুটা বেশি। বাংলাদেশের লাল তালিকা অনুযায়ী মাছটি বর্তমানে বিপদমুক্ত। তবে নদীর তলায় বসবাসকারী এই মাছের সংখ্যা কতটা বাড়ছে বা কমছে, তার নিয়মিত হিসাব রাখার মতো গবেষণা এখনও পর্যাপ্ত নয়। উপকূল ও মোহনায় লবণাক্ততা ক্রমশ বাড়ছে, যা ইন্দুর বাইলার মতো মোহনাপ্রিয় মাছের জন্য কতটা ভালো বা খারাপ, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।



