বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার ১০৮তম জন্মবার্ষিকী আজ ১৮ জুলাই। এই দিনে ফিরে দেখা হচ্ছে তার জীবনের নানা দিক। তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাবেক চিফ অব স্টাফ বারবারা মাসেকেলা সম্প্রতি জানিয়েছেন, ম্যান্ডেলা ছিলেন গভীর বিষণ্নতায় ভোগা একজন মানুষ। মাসেকেলার ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ম্যান্ডেলার মতো এত গভীর বিষণ্ন কোনো মানুষের দেখা তার জীবনে পাননি। কখনো কখনো তার মনে হতো, ম্যান্ডেলা যেন ‘নিস্তব্ধতা, ভীষণ ভয়ংকর এক নিস্তব্ধতার’ প্রতিরূপ।
২০২৩ সালে প্রকাশিত ‘উইনি অ্যান্ড নেলসন: পোর্ট্রেট অব আ ম্যারেজ’ বইয়ের সূত্র ধরে এই বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বইটির লেখক খ্যাতনামা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক জনি স্টেইনবার্গ দ্য কনভারসেশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ম্যান্ডেলার জীবনী চর্চায় এই দুঃখময়তার আভাস পাওয়া যায়। তিনি গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, তার জীবনের গল্প আসলে একটি ট্র্যাজেডি। তিনি জানতেন, তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান জীবিত মানুষদের একজন, কিন্তু কখনোই মনে করেননি যে এই যশ-খ্যাতি তাকে প্রকৃত সুখ দিতে পারে অথবা যা তিনি হারিয়েছেন তার বিকল্প হতে পারে।
দীর্ঘ ২৭ বছর বর্ণবাদী শাসকের কারাগারে কাটিয়েছেন ম্যান্ডেলা। রোবেন দ্বীপের সেই ছোট্ট কারা প্রকোষ্ঠে তাকে পাথর ভাঙার কাজে বাধ্য করা হতো। বছরে মাত্র একজন দর্শনার্থীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ ছিল, আর প্রতি ছয় মাসে একটি চিঠি পাঠানো বা গ্রহণ করা যেত। কারাবন্দী অবস্থায় ১৯৬৮ সালে তার মা এবং ১৯৬৯ সালে তার বড় ছেলে থেমবির মৃত্যুর শোকেও তাকে শোকযাত্রায় অংশ নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পাওয়ার পর তিনি শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু শাসনের অবসান ও গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় নেতৃত্ব দেন।
১৯৪৪ সালে এএনসি যুবলীগ গঠনে সহায়তা করার মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। ১৯৫২ সালে এএনসি ডিফায়েন্স ক্যাম্পেইনের জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক-প্রধান নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালের দেশদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬১ সালে খালাস পান। এরপর আত্মগোপনে চলে যান এবং সশস্ত্র সংগঠন উমখন্তো উইসিজওয়ে গঠনে সহায়তা করেন। ১৯৬২ সালে গ্রেপ্তার হয়ে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৬৩ সালে রিভোনিয়া ট্রায়ালে নাশকতার অভিযোগে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতে দেওয়া তার বিখ্যাত ভাষণে তিনি বলেন, ‘আমি শ্বেতাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধে লড়েছি, কৃষ্ণাঙ্গ শাসনের বিরুদ্ধেও লড়েছি। আমি এমন একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্ত সমাজের স্বপ্ন লালন করি, যেখানে সবাই সাম্য ও সম্প্রীতির মধ্যে বসবাস করবে।’
মুক্তির পর ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম সর্বজনীন গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়লাভ করেন এবং দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ১৯৯৪ সালের ১০ মে। ১৯৯৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্কের সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন। এক মেয়াদ পূর্ণ করেই ১৯৯৯ সালে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে দেন এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৯৭ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উপলক্ষে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন এবং শিখা চিরন্তন উদ্বোধন করেছিলেন।
শৈশব থেকেই নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছিলেন ম্যান্ডেলা। দক্ষিণ আফ্রিকার এম্ভেজে গ্রামে ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই তার জন্ম। বাবা গাডলা হেনরি এমফাকানিসিওয়া ছিলেন থেম্বু গোত্রের প্রধান। বাবার মৃত্যুর পর ১২ বছর বয়সে তাকে দত্তক নেন থেম্বু রিজেন্ট জঙ্গিনাতাবা ডালিন্ডিয়েবো। প্রাইমারি স্কুল শেষে ক্লার্কবারি বোর্ডিং ও হিল্ডটাউনে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালে ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি ভঙ্গের অপরাধে বহিষ্কৃত হন। পরে আইন পড়াশোনা শেষ করে আইনজীবী হিসেবে জীবন শুরু করেন এবং আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে যোগ দেন।
বিষণ্নতা ও ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডির মধ্যেও তিনি কখনো প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তার ভাষায়, ‘প্রতিশোধ নিলে, আমরা কীভাবে ওদের চেয়ে ভালো হলাম?’ ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর জোহানেসবার্গে নিজ বাড়িতে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার মৃত্যুতে বিশ্ব হারায় মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও পুনর্মিলনের এক অনন্য প্রতীককে।




