পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে শিশুদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের একটি বড় ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। করাচির কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতাল ও এর আশপাশের এলাকায় সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। সিন্ধু প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত সাড়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষের স্ক্রিনিং করা হয়েছে, যার মধ্যে ১২০ জনের শরীরে এইচআইভি শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া করাচির লান্ধি এলাকায় সিন্ধু এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (সেসি) পরিচালিত আরেকটি কেন্দ্রে পরীক্ষায় আরও ১০ জন সংক্রমিত পাওয়া গেছে। সেসি একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রাদেশিক সংস্থা, যা শিল্প ও বাণিজ্য খাতের শ্রমিক ও তাদের পরিবারের স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করে।
প্রথম দফায় এই সংকটের সূত্রপাত ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যখন করাচির ‘সাইট টাউন’ এলাকার বাসিন্দারা লক্ষ্য করেন যে ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া বেশ কয়েকজন শিশু একসঙ্গে সংক্রমিত হয়েছে। তবে কর্মকর্তারা বলছেন, সংক্রমণের শুরু ২০২৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে, যখন প্রাদেশিক স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে প্রথম ছয়জন এইচআইভি পজিটিভ রোগীর তথ্য আসে।
গত ১৪ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে দুটি তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। তাতে বড় ধরনের গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে—সংক্রমণ প্রতিরোধের নিয়মকানুন ঠিকমতো না মানা, সুরক্ষাসামগ্রীর অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জের যথাযথ ব্যবহার না করা। গত বছরের নভেম্বরে প্রথম তদন্ত প্রতিবেদনে ১৬ জন শিশুর এইচআইভি শনাক্তের কথা বলা হয়, যারা সবাই কেবিভি হাসপাতালের শিশু বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছিল। গত ১৯ জুন দ্বিতীয় ও আরও বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রাদেশিক ন্যায়পালের কাছে জমা দেওয়া হয়, যেখানে ৭৮ জনের আক্রান্ত হওয়া ও ৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। সেই প্রতিবেদনে হাসপাতালের নির্দিষ্ট কর্মীদের প্রশাসনিক ও তদারকির ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হয়েছে। এরপর থেকে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে।
প্রাদেশিক শ্রমমন্ত্রী সাঈদ গনি জানিয়েছেন, আক্রান্ত সব রোগীই ২০২৫ সালের অক্টোবরের আগে সংক্রমিত হয়েছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। তিনি আরও বলেন, ‘নতুন রোগী পাওয়া যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও পরীক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হবে।’ গত ৩ জুলাই হাসপাতালটির ৩৭ জন চিকিৎসক ও কর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। জবাব দেওয়ার জন্য তাঁদের ১৪ দিন সময় দেওয়া হয়েছে। সাঈদ গনি জানান, তদন্তে দোষী সাব্যস্তদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও চাকরি থেকে বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি নিজের ‘পরোক্ষ দায়’ স্বীকার করে বলেন, পদত্যাগ করলে যদি এই সংকটের সমাধান হয়, তবে তাতেও তাঁর আপত্তি নেই।
সিন্ধু হাইকোর্টে দায়ের করা একটি রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়, সিরিঞ্জ বারবার ব্যবহারের কারণেই এইচআইভি ছড়িয়েছে। তবে ৪ জুলাই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গনি দাবি করেন, কেবিভি হাসপাতালে ‘অটো-ডিজেবল’ সিরিঞ্জ ব্যবহার করা হয়, যা দ্বিতীয়বার ব্যবহারের সুযোগ নেই। অথচ সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনগুলো বলছে ভিন্ন কথা—সংক্রমণ প্রতিরোধের পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়েছিল। সিন্ধু হাইকোর্টের ওই আবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়, সরকারি হিসাবের চেয়ে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি।
এটি সিন্ধুতে প্রথম বড় আকারের এইচআইভি প্রাদুর্ভাব নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ইউএনএইডস পাকিস্তানের এই সংকটকে ডব্লিউএইচওর পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল মহামারিগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে। গত ১৫ বছরে পাকিস্তানে বার্ষিক এইচআইভি সংক্রমণের হার ২০০ শতাংশ বেড়েছে—২০১০ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৬ হাজার, যা ২০২৪ সালে ৪৮ হাজারে পৌঁছেছে। গত ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবসে ডব্লিউএইচও ও ইউএনএইডসের যৌথ বিবৃতিতে ধারণা দেওয়া হয়, পাকিস্তানে বর্তমানে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন, যার মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ জানেনই না যে তাঁরা আক্রান্ত। শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের সংখ্যা ২০১০ সালে ৫৩০ থেকে বেড়ে ২০২৩ সালে ১ হাজার ৮০০ জনে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছে, আর গর্ভবতী নারীদের মধ্যে মাত্র ১৪ শতাংশ মায়ের কাছ থেকে শিশুতে সংক্রমণ ঠেকানোর থেরাপি পাচ্ছেন।
গত জুনে ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট এইচআইভি’-তে চিকিৎসকেরা একটি নিবন্ধে যুক্তি দেন, পাকিস্তানের এই মহামারি এখন ‘বড় অংশে চিকিৎসাব্যবস্থার মাধ্যমেই’ ছড়িয়ে পড়ছে। অনিরাপদ চিকিৎসাপদ্ধতির কারণে বারবার এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। তবে এই মূল্যায়ন এখনো চূড়ান্ত নয়। গবেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানে বিস্তৃত নজরদারি ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। যৌন মিলন, মায়ের থেকে শিশুতে সংক্রমণ কিংবা শিরায় মাদক নেওয়ার তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো থেকে কতজন সংক্রমিত হচ্ছেন, তা নির্ধারণ করা যাচ্ছে না।
করাচির আগা খান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ ফয়সাল মাহমুদ আল-জাজিরাকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে প্রধান কারণ ঠিক কোনটি, তা নিশ্চিত করে বলা প্রায় অসম্ভব।’ তিনি আরও বলেন, ‘যৌন সম্পর্ক, মায়ের কাছ থেকে শিশুতে সংক্রমণ এবং শিরায় মাদক গ্রহণের বিষয়ে সংখ্যাগুলো তুলনামূলকভাবে বেশ নির্ভরযোগ্য, কারণ সেখানে প্রতিষ্ঠিত নজরদারি কাঠামো রয়েছে। কিন্তু ক্লিনিক, হাসপাতাল বা হাতুড়ে চিকিৎসকদের কাছে গিয়ে কত মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন, তা পর্যবেক্ষণের জন্য কোনো কাঠামোগত ব্যবস্থা নেই।’ এই প্রবণতা শুধু কেবিভি হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়। করাচির আরও তিনটি হাসপাতালে এইচআইভি আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ার খবর পাওয়া গেছে। একটি হাসপাতালে ২০২৪ সালে আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছিল ১০ জন, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিন্ধু প্রদেশে ৮৯৪ জন এইচআইভি রোগী শনাক্ত হয়, যার মধ্যে ৩২৯ জনই শিশু। গত এপ্রিলে পাকিস্তান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন বলেছিল, এই পরিসংখ্যানটি মূলত ‘হিমশৈলের চূড়া মাত্র’।
ফয়সাল মাহমুদের মতে, এসব ঘটনা আরও বড় কোনো সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি পদ্ধতিগত সমস্যা—কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। বরং সারা দেশে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরেই ইনজেকশনের সিরিঞ্জ ব্যবহারের ক্ষেত্রে চরম অবহেলা ও নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে আছে।’ তিনি ডায়ালাইসিস কেন্দ্রগুলোতে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কারণে ঘটা প্রাদুর্ভাবের দিকেও ইঙ্গিত করেন। হেপাটাইটিস ‘সি’ আক্রান্ত রোগীর সংখ্যায় বিশ্বে শীর্ষ দেশগুলোর একটি পাকিস্তান। ফয়সাল বলেন, বর্তমানে এইচআইভি ছড়ানোর পেছনে যেসব কারণ কাজ করছে, ঠিক একই কারণে হেপাটাইটিস সি-ও ছড়াচ্ছে।
সিন্ধু হাইকোর্ট সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ ও ফেলার ক্ষেত্রে প্রাদেশিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সরকারকে ২০ জুলাই পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ৩ জুলাই সারা দেশে মানহীন সিরিঞ্জ ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। ড্রাগ রেগুলেটরি অথরিটি অব পাকিস্তান জানায়, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য সাধারণ সিরিঞ্জের খুচরা বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ হবে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মুস্তাফা কামাল বলেছেন, সারা দেশে যেকোনো অস্ত্রোপচারের আগে এইচআইভি পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হবে। তবে তিনি বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মহামারি’ বলার বিষয়ে সতর্ক করেছেন।
প্রাদেশিক ন্যায়পালের নজরে আসার পর সিন্ধু সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য ২০০ কোটি রুপি (৭২ লাখ ডলার) তহবিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং কেবিভি হাসপাতালের কেনাকাটা ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সিন্ধু স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের মন্তব্য জানতে আল-জাজিরার পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ফয়সাল মাহমুদ বলেন, সিরিঞ্জ নিষিদ্ধ করার মতো পদক্ষেপগুলো এই সমস্যার আংশিক সমাধান মাত্র। পাকিস্তানের প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসাসেবা দেয় বেসরকারি খাত, যা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক বেশি কঠিন। তিনি বলেন, ‘বেসরকারি খাতে শুধু হাসপাতালই নয়, অনেক ক্লিনিক, ফার্মেসি ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে। হেলথকেয়ার কমিশনগুলো নামমাত্র তদারকি করে, কারণ প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের মতো পর্যাপ্ত জনবল নেই।’ পাকিস্তানের চিকিৎসাসেবায় ইনজেকশনের অনিরাপদ ব্যবহার গভীরভাবে মিশে আছে—শুধু দুর্বল নজরদারিই নয়, রোগীদের প্রত্যাশাও একটি বড় কারণ। ফয়সাল ব্যাখ্যা করেন, ‘চিকিৎসকের কাছে এলে রোগীরা আশা করেন যে তাঁদের ইনজেকশন দেওয়া হবে, কারণ তাঁরা বিশ্বাস করেন এতে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। অনেক সময় স্বাস্থ্যকর্মীরাও এমনটাই ভাবেন। সব মিলিয়ে এটি একটি বড় বিপর্যয়ের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।’



