টানা বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় অতিষ্ঠ যশোরের ভবদহ অঞ্চলের বাসিন্দারা সোমবার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ ও অবস্থান ধর্মঘট করেছেন। ‘পানি সরাও, মানুষ বাঁচাও’ এবং ‘অবিলম্বে টিআরএম বাস্তবায়ন চাই’-সহ নানাবিধ স্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত চলা এ গণ-অবস্থানে পাঁচ শতাধিক নারী-পুরুষ যোগ দেন। কর্মসূচিটি আয়োজন করে ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি।
প্রতিবাদ জমায়েত শেষে সংগঠনের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসানের কাছে একটি স্মারকলিপি হস্তান্তর করা হয়, যা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর কাছে পেশ করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়। কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ, উপদেষ্টা তসলিম-উর-রহমান ও সদস্যসচিব চৈতন্য পাল প্রমুখ বক্তব্য প্রদান করেন। এছাড়া জেলা পরিষদের প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন খান খোকন ও সাংস্কৃতিক কেমি সানোয়ার আলম খান দুলুও বক্তব্যে সংহতি প্রকাশ করেন।
সংগঠনটির চার দফা দাবির সিংহভাগই ঘিরে রয়েছে জলজটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা। এর মাঝে রয়েছে ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডব্লিউএম) চলমান সমীক্ষায় উত্থাপিত প্রস্তাবনাটিকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন ও নদী খননের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে টিআরএম (টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট) চালু করা; অতি জরুরি ভিত্তিতে আমডাঙ্গা খালের সংস্কার সম্পন্ন করানো এবং সংশ্লিষ্ট দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগে দোষীদের আইনের আওতায় আনা; খুলনার ডুমুরিয়ার খর্ণিয়া সেতুর দক্ষিণ প্রান্তের হরি নদে থাকা সকল আড়বাঁধসহ অন্যান্য বাঁধ অবিলম্বে অপসারণ এবং উক্ত স্থান থেকে কুলবাড়িয়া পর্যন্ত নদের পলি তোলা; এবং শেষত, পানিবন্দি মানুষদের স্বাস্থ্যসেবা, চিকিৎসা ও খাদ্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা।
উল্লিখিত, যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার বিশাল একটি অংশ নিয়ে পরিচিত ভবদহ অঞ্চল। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদ-নদীর স্রোতোধারা এই অঞ্চলের জলস্তর নির্ধারণ করে। বর্তমানে সেনাবাহিনীর তদারকিতে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচটি নদী ও নদের প্রায় সাড়ে ৮১ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে খননকাজ চলছে। কিন্তু এর মাঝেই গত জুলাইয়ের অতি বর্ষণে শতাধিক গ্রামের ঘরবাড়ি, পথঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও চাষাবাদি জমি পানির নিচে তলিয়ে যায়, যার ফলে প্রায় এক লক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন।
কর্মসূচিতে আগত ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে চরম দুর্দশার চিত্র ফুটে উঠে। মনিরামপুরের কুলটিয়া গ্রামের গৃহবধূ অনিমা বিশ্বাস বর্ণনা করেন, তার বাড়ির উঠোন হাঁটুসমান পানিতে ডুবে আছে এবং ঘরের ভেতরেও পানি ঢোকার উপক্ৰম। গোয়ালঘর ও রান্নাঘরেও জ্বলার কারণে গবাদি পশু ও হাঁস-মুরগি নিয়ে দুঃসহ অবস্থার কথা জানান তিনি। একই অঞ্চলের বয়বৃদ্ধা কমলা বৈরাগীও বাড়িতে টিকে থাকার অক্ষমতার কথা জানান। অন্যদিকে অভয়নগরের কৃষক তুষার সরকার জানান, জমিতে ফসল না হওয়ায় অনেক সময় তারা না খেয়ে কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন এবং স্থায়ী সমাধান হিসেবে টিআরম চালুই ও বিলের পানি নিষ্কাশনের দাবি জানাতেই তারা আন্দোলনে সামিল হয়েছেন।
ইকবাল কবির জাহিদ সতর্ক করে বলেন, নদী খনন হচ্ছে, কিন্তু তার পাশাপাশি টিআরএম বাস্তবায়ন না করলে নদী পুনরায় পলিতে ভরাট হয়ে যাবে এবং ১৪০ কোটির প্রকল্পের অর্থ ফেইল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বক্তারা আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে ষাটের দশকে আরোপিত কর্ডন পলিসিই গত ৪৫ বছর ধরে এই জলাবদ্ধতার চক্রাকার গড়ে তোলার পেছনে মূল দায়ী, যা স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জনজীবনকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।




