মস্তিষ্ক মানবদেহের সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এর কোনো সমস্যা হলে পুরো অস্তিত্বই বিপন্ন হতে পারে। অনেকে চলনশক্তি হারান, খাবার গিলতে পারেন না, স্মৃতিশক্তি বা চেতনাও লোপ পায়। বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সঠিক জীবনাচরণের মাধ্যমে মস্তিষ্কের বেশিরভাগ রোগ প্রতিরোধ সম্ভব। বয়স্কদের মধ্যে সমস্যা বেশি দেখা গেলেও তরুণ বয়সের অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখে।

স্ট্রোক মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে কোষ নষ্ট হওয়ার নাম। একে ইশকেমিক স্ট্রোক বলে। অন্যদিকে রক্তনালি ছিঁড়ে ভেতরে রক্তক্ষরণ হলে তা হেমোরেজিক স্ট্রোক। বিশ্বব্যাপী অকালমৃত্যু ও পঙ্গুত্বের বড় কারণ এটি। আক্রান্তের মুখ বেঁকে যেতে পারে, কথা জড়িয়ে যায়, অসংলগ্ন আচরণ দেখা দেয়। অনেকের নাকের নল দিয়ে খাবার দিতে হয়, প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ চলে যায়, কেউ কেউ পুরোপুরি শয্যাশায়ী হন। কিন্তু স্ট্রোক পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য। এর মূল কারণ অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে ক্ষতিকর চর্বি ও ধূমপান। বর্তমানে অল্প বয়সেও স্ট্রোক হচ্ছে। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা ও পর্যাপ্ত ঘুম জরুরি। শাকসবজি, ফলমূল, গোটা শস্য, বাদাম, ডাল ও বীজ খেতে হবে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, ফাস্টফুড, কোমল পানীয়, চিনি ও অতিরিক্ত লবণ এড়িয়ে চলতে হবে। সস, কেচাপ, সয়া সস, পনির, মেয়োনেজ, চিপস, চানাচুর, কাসুন্দি, শর্ষে—এসবেও লবণ বেশি থাকে। ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জনীয়। মানসিক চাপমুক্ত থাকতে হবে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা কোলেস্টেরল থাকলে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হবে। স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে পরিবারের সবাইকে সচেতন থাকতে হবে; প্রতি মিনিট মূল্যবান। দ্রুত হাসপাতালে নিলে মস্তিষ্কের ক্ষতি কমে।

ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রমের প্রধান কারণ আলঝেইমারস। ঘুমের অভাবে মস্তিষ্কে বিটা অ্যামাইলয়েড নামে ক্ষতিকর পদার্থ জমে। তাই প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। ছোট ছোট অভ্যাসও কার্যকর—নতুন জিনিস শেখা, নতুন ভাষা, পাজল, শব্দজব্দ, সুডোকু খেলা, বই পড়া, মনোযোগের কাজ করা। পরিবার ও সমাজে সময় কাটানো, নিয়মিত ব্যায়াম ও সুষম খাদ্য আবশ্যক। ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অলিভ অয়েলের মতো স্বাস্থ্যকর তেল গ্রহণ করা যেতে পারে, তবে সঠিক ব্যবহার জানতে হবে। মাছের তেলেও ওমেগা-৩ আছে, বিশেষ করে সামুদ্রিক মাছে। সপ্তাহে অন্তত দুই থেকে তিন দিন মাছ খাওয়া ভালো।

পারকিনসনস ডিজিজে হাত কাঁপে, ধীরগতি আসে, পদক্ষেপ ছোট হয়, হাতের লেখা ছোট হয়ে যায়, স্মৃতিশক্তিও কমে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ঝুঁকি বাড়ে। নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস ও নিয়মিত ব্যায়াম ঝুঁকি কমাতে পারে। কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের মতো ক্ষতিকর পদার্থ এড়াতে শাকসবজি ও ফলমূল ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়া জরুরি। চিকিৎসা সত্ত্বেও রোগ বাড়তে পারে, তবে সঠিক ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি ও পরিচর্যার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব।

মস্তিষ্কে আঘাতের অন্যতম কারণ দুর্ঘটনা। অধিকাংশই ঘটে সচেতনতা ও সতর্কতার অভাবে। পথে তাড়াহুড়া না করা, বেপরোয়া গতি এড়ানো, রাস্তা পারাপারে নিয়ম মেনে চলা, মুঠোফোন ব্যবহার না করা জরুরি। বাইকে হেলমেট ও গাড়িতে সিটবেল্ট ব্যবহার করতে হবে। মাথা ঘোরা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, রক্তে শর্করা বা ইলেকট্রোলাইট কমে গেলে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পিচ্ছিল পথ এড়িয়ে চলা, বাড়ি ও বাথরুম পিচ্ছিলমুক্ত রাখা, বয়স্কদের জন্য হাতল, লাঠি বা ওয়াকারের ব্যবস্থা করা ভালো। বয়সের সঙ্গে ভারসাম্য নষ্ট হয়, তাই তরুণ বয়স থেকেই ভারসাম্যের ব্যায়াম করা উচিত।

খিঁচুনি জ্বর বা সংক্রমণের কারণে হতে পারে, আবার জিনগত কারণেও হতে পারে। জিনগত হলে প্রতিরোধের উপায় নেই, শুধু চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। প্রাপ্তবয়স্কে হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হলে কারণ হতে পারে মস্তিষ্কের প্রদাহ, স্ট্রোক, হাইপোগ্লাইসেমিয়া, ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যহীনতা বা টিউমার। মেনিনজাইটিসের টিকা নেওয়া জরুরি, বিশেষ করে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম থাকলে বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ভ্রমণের আগে। কানের পর্দায় ছিদ্র থাকলে চিকিৎসা করাতে হবে, কারণ এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। ডায়রিয়া বা বমিতে স্যালাইন ও তরল গ্রহণ করতে হবে। তীব্র মাথাব্যথা বা অতিরিক্ত বমি উপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। ডায়াবেটিস থাকলে হাইপোগ্লাইসেমিয়া এড়াতে দীর্ঘ সময় খালি পেটে থাকা যাবে না।