প্রায় সহস্র বছর আগে মধ্য আমেরিকার আজটেক ও মায়া সভ্যতায় চিয়া বীজের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ভুট্টা, শিম ও স্কোয়াশের পাশাপাশি এটি শুধু প্রধান খাদ্যই ছিল না, বরং কর পরিশোধ ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেও ব্যবহৃত হতো। সেই প্রাচীন বীজ এখন বিশ্বজুড়ে সুপারফুড হিসেবে জনপ্রিয়। তবে এর পুষ্টিগুণের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনো অনেকের অজানা। এই শূন্যতা পূরণ করে সম্প্রতি ‘কোজেন্ট ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার’ সাময়িকীতে একটি বড় পর্যালোচনাধর্মী গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে।
তানজানিয়ার গবেষক জোয়াকিম মাতোন্দো ও সিরি আবিহুদি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা একত্র করে এই পর্যালোচনা তৈরি করেন। এতে চিয়া বীজের পুষ্টিগুণ ও স্বাস্থ্যোপকারিতা সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। চিয়ায় রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড (এএলএ), উচ্চমানের উদ্ভিজ্জ প্রোটিন, মিউসিলেজ নামক দ্রবণীয় আঁশ ও বি-ভিটামিন। এছাড়াও এতে উপস্থিত প্রোটিন হজমের পর ছোট ছোট পেপটাইডে পরিণত হয়, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করতে পারে।
গবেষণায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে হৃদযন্ত্র ও রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে চিয়ার ভূমিকার ওপর। ওমেগা-৩ ও অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট প্রদাহ কমায় এবং রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফলে হৃদরোগের ঝুঁকি হ্রাস পায়। অন্যদিকে দ্রবণীয় আঁশ পানি শুষে জমাট বেঁধে খাদ্যের গ্লুকোজ শোষণের গতি শ্লথ করে দেয়। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে না গিয়ে ধীরে ধীরে বাড়ে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত হয়। ওজন নিয়ন্ত্রণেও চিয়া ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। এর আঁশ পেটে গিয়ে ফুলে ওঠে এবং ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনকে প্রভাবিত করে, ফলে দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা অনুভূতি বজায় থাকে। অন্ত্রের জন্যও চিয়া উপকারী; এটি প্রিবায়োটিকের মতো কাজ করে উপকারী ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ঘটায় এবং শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড উৎপাদনে সাহায্য করে, যা সার্বিক অন্ত্রস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।
শুধু স্বাস্থ্য নয়, খাদ্যশিল্পেও চিয়া বীজের জেল তৈরির গুণ ব্যাপকভাবে কাজে লাগছে। গ্লুটেন-মুক্ত বেকারি পণ্যে গঠন ধরে রাখতে, কুকিজ বা মাংসজাত পণ্যে চর্বির বিকল্প হিসেবে এবং ভিগান খাবারে ডিমের বদলে চিয়া ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কিছু সতর্কতার বিষয়ও গবেষণায় বলা হয়েছে। যদিও বিরল, তবু কারও কারও চিয়ায় অ্যালার্জি থাকতে পারে। এছাড়া ফাইটিক অ্যাসিড ক্যালসিয়াম, আয়রন ও জিংকের মতো খনিজ শোষণে বাধা দিতে পারে। অসম্পৃক্ত চর্বি বেশি থাকায় চিয়া বীজ সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে জারিত হয়ে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
ভবিষ্যতে চিয়া বীজের প্রাকৃতিক অণুজীবসমষ্টি (ন্যাটিভ মাইক্রোবায়োম) এবং আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ পদ্ধতি নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন গবেষকেরা। তাঁরা বলছেন, চিয়া শুধু জনপ্রিয় একটি সুপারফুড নয়, বরং এর পুষ্টিগুণের পক্ষে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ রয়েছে। তবে কোন খাবারই একা অলৌকিক ফল দেয় না। তাই সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে চিয়া খাওয়াই সর্বোত্তম। নতুন খাবার নিয়মিত গ্রহণের আগে শারীরিক অবস্থা বিবেচনা ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।



