প্রখর স্মৃতিশক্তি, অসাধারণ হাতের লেখা আর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের অপূর্ব সমাহার—এমনই ছিলেন কেশবপুর পাইলট স্কুল অ্যান্ড কলেজের (বর্তমানে কেশবপুর সরকারি পাইলট উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়) শিক্ষক মো. মঈন উদ্দীন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। শিক্ষক দিবসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক স্মৃতিচারণা প্রকাশ পেয়েছে।

মঈন স্যারের কাছে পড়ার স্মৃতি রোমন্থন করে এক ছাত্র জানান, প্রথমে তাঁকে ভয় লাগলেও পরবর্তী সময়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে কেশবপুরের সেরা স্কুলে ভর্তি হয়ে সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর বন্ধুরা বিভিন্ন শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়তে শুরু করে। বাবার জোরাজুরিতে মঈন স্যারের কাছে ইংরেজি পড়তে যান তিনি। প্রথম দিন স্যারকে লুঙ্গি-চাদর পরা অবস্থায় শিক্ষার্থীদের পড়াতে দেখে ভীষণ অবাক হন। স্যার তাঁকে পাশে ডেকে বসান। সেই ভীতি কাটিয়ে ওঠে।

মঈন স্যার ছিলেন বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারী। শুধু ইংরেজি নয়, বিজ্ঞান, বাংলা সাহিত্য, ইংরেজি সাহিত্যসহ সব বিষয়েই তাঁর অসাধারণ দখল ছিল। একটি শব্দ বললেই তিনি তার বিপরীতার্থক, সমার্থক ও আরও দশটি শব্দ বলে দিতেন। উপপাদ্য বুঝাতেন অভিনব কায়দায়। তাঁর রসবোধও ছিল অসাধারণ—গম্ভীর মুখে মজার কথা বলে পুরো বারান্দা হাসিয়ে দিতেন। নতুন শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করতেন, ‘রোল কত? কত রোলের মধ্যে ঢুকতে চাস?’ লক্ষ্য পূরণের কৌশলও বুঝিয়ে দিতেন মৃদু হাসির মাধ্যমে।

অসাধারণ স্মরণশক্তি ছিল তাঁর। পুরো উপজেলার অর্ধেকের বেশি মানুষ তাঁর ছাত্র বলে জানান এই স্মৃতিচারণকারী। অবসরে যাওয়ার আগেও তরুণ শিক্ষকের মতো উচ্ছ্বাস নিয়ে ক্লাস নিতেন। বয়স যেন কমে ২৭-২৮-এ নেমে আসত। হাতের লেখাও ছিল অনন্য—কাঁপা হাতের অক্ষরগুলো কাগজে মুক্তার মতো ফুটে উঠত। ব্ল্যাকবোর্ড বা হোয়াইটবোর্ডের লেখাও কাগজে লেখার মতো সুন্দর করতেন।

একটি ঘটনা মনে করে তিনি বলেন, কলেজে পড়ার সময় পিকনিকে বাজার করতে গিয়ে স্যারকে দেখতে পান। শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের পর স্যার জিজ্ঞেস করেন, ‘গোস্বামী, ভালো আছিস তো? তোর মামাবাড়ি না বাগেরহাট?’ বন্ধুরা স্তম্ভিত হয়ে যায়—ছাত্রের মামাবাড়ির কথা পর্যন্ত স্যারের মনে আছে।

মঈন স্যার সব সময় বলতেন, ‘সৎ থাকলেই হবে, আর কিছুর প্রয়োজন নেই। যেটাই করবি, সততার সঙ্গে করবি। পরীক্ষায় নকল করে ভালো কিছু করা যায় না। আজ নকল করছিস, কিছুদিন পর চাকরি করতে গিয়ে ঘুষ খাবি। খারাপ কাজের সঙ্গে যুক্ত হবি।’ তাঁর এই শিক্ষাই চিরকাল ছাত্রদের পথ দেখিয়ে যাবে বলে মনে করেন লেখক।