প্রতিদিনের অফিসের ব্যস্ততা, বন্ধুদের আড্ডা অথবা পথ চলার ক্লান্তি দূর করতে গরম চা আমাদের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু সেই চা যদি ডিসপোজেবল প্লাস্টিকের কাপে পরিবেশিত হয়, তাহলে আরামের পাশাপাশি শরীরে প্রবেশ করতে পারে অদৃশ্য এক বিপদ। সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, উত্তপ্ত পানীয় প্লাস্টিকের সংস্পর্শে এলে কাপের পৃষ্ঠ থেকে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা—যাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও আরও সূক্ষ্ম ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়—পানীয়তে মিশে যেতে পারে। এগুলো চোখে দেখা না গেলেও চায়ের সঙ্গে দেহে চলে যায়। মাইক্রোপ্লাস্টিক বলতে পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে বোঝানো হয়। ইদানীং গবেষণায় মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা এবং অন্যান্য অঙ্গেও এই কণাগুলোর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এসব কণার দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা এখনও চলমান থাকলেও বিজ্ঞানীরা ইতিমধ্যেই সাবধানতা অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। শুধু প্লাস্টিক কণাই নয়, নিম্নমানের কিছু প্লাস্টিক থেকে তাপের প্রভাবে বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থও নির্গত হতে পারে। এসব উপাদানের কিছু হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটাতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উদ্বেগ প্রকাশিত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিকের স্বাস্থ্যগত প্রভাব সম্পর্কে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে প্লাস্টিক দূষণ হ্রাস এবং অপ্রয়োজনীয় সংস্পর্শ এড়ানোই বর্তমানে সবচেয়ে নিরাপদ পন্থা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সুরে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) ওয়ানটাইম প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। অনেকে মনে করেন, কাগজের কাপ সম্পূর্ণ নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ ডিসপোজেবল কাগজের কাপের ভেতরে পাতলা প্লাস্টিকের আবরণ থাকে, যাতে তরল চুইয়ে না পড়ে। ফলে খুব গরম পানীয় দীর্ঘ সময় ধরে রাখা হলে সেখান থেকেও ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পানীয়তে মিশে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রতিদিন বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ প্লাস্টিকের কাপে চা পান করেন। ব্যবহারের পর এসব কাপের সিংহভাগই পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয়। সেগুলো ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়ে নদী, খাল, মাটি ও খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে একটি প্লাস্টিকের কাপ একই সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ—উভয় ক্ষেত্রেই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, গরম চা বা কফির জন্য কাচ, সিরামিক অথবা স্টেইনলেস স্টিলের কাপ ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ। হয়তো একবার প্লাস্টিকের কাপে চা পান করলে তাত্ক্ষণিক কোনো বড় ক্ষতি নাও হতে পারে, কিন্তু প্রতিদিনের এই ছোট অভ্যাস দীর্ঘ মেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এক কাপ চায়ের স্বাদ মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়, কিন্তু সেই কাপ থেকে শরীরে প্রবেশ করা অদৃশ্য প্লাস্টিকের প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী—সেটির উত্তর খুঁজছেন এখনও বিজ্ঞানীরা। তাই সতর্ক থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ। প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশ গ্রিন ইনিশিয়েটিভের মতে, দৈনন্দিন জীবন থেকে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের কাপ বাদ দেওয়াই উত্তম।
প্লাস্টিকের কাপে চা: অদৃশ্য স্বাস্থ্যঝুঁকির সতর্কতা
গরম চা প্লাস্টিকের কাপে পান করলে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিক দেহে প্রবেশ করতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন। কাগজের কাপও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। বিশেষজ্ঞরা কাচ, সিরামিক বা স্টেইনলেস স্টিলের কাপ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।


