বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব জার্নালিস্টস (বিএজে) সোমবার জানিয়েছে, জুলাই মাস জুড়ে দেশের অন্তত ৬৪ জন সংবাদকর্মী বিভিন্ন ধরনের আক্রমণ, আইনি হয়রানি, ভীতি প্রদর্শন এবং পেশাগত বাধার মুখে পড়েছেন। সংগঠনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সময়ে ৩৭ জন সাংবাদিক শারীরিকভাবে আহত হয়েছেন। এছাড়া ১২ জন আইনি জটিলতায় জড়িয়েছেন এবং ১৫ জন হুমকি ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। একটি গণমাধ্যমের ফেসবুক পাতায় সাইবার আক্রমণের ঘটনাও ঘটেছে।
বিএজের মতে, এই ঘটনাগুলো বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য উদ্বেগজনক। গত মাসগুলোর মতো জুলাই মাসেও সাংবাদিকদের জন্য কাজের পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকরা শারীরিক নিগ্রহ, হয়রানিমূলক মামলা এবং প্রাণনাশের হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। এই প্রতিবেদন মূলধারার বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত সংবাদ এবং বিএজের নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।
শারীরিক আক্রমণে ৩৭ সাংবাদিক আহত: প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, জুলাই মাসে ২৯টি পৃথক ঘটনায় কমপক্ষে ৩৭ জন সাংবাদিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছেন। এসব হামলায় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী, কিশোর গ্যাং এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে— চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীদের হাতে সাংবাদিক হেনস্তা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের লাঠিচার্জে দুই সাংবাদিক আহত, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলার ভিডিও ধারণ করায় তিন সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করা, এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিভাগের শিক্ষার্থীদের হামলায় চার সাংবাদিক আহত হওয়ার পাশাপাশি তাদের মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়া। এছাড়া কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে এক সাংবাদিকের অফিসে কিশোর গ্যাং অস্ত্রের মুখে হুমকি দেয়, ফেনীর ছাগলনাইয়ায় এক সাংবাদিককে মারধর করে নদীতে ফেলে হত্যার চেষ্টা করা হয়, কুয়াকাটায় ছাত্রদল ও যুবদল নেতাদের হাতে হাতুড়িপেটার ঘটনা ঘটে, বেনাপোলে সন্ত্রাসী হামলায় এক সাংবাদিকের মাথায় গুরুতর জখম হয়, এবং খুলনায় রাতে আড্ডারত সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে দুর্বৃত্তদের গুলিতে এক সাংবাদিক আহত হন।
আইনি হয়রানির শিকার ১২ সাংবাদিক: বিএজে বলছে, সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে মানহানি, চাঁদাবাজি ও নাশকতার মামলাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। জুলাই মাসে অন্তত ১২ জন সাংবাদিক বিভিন্ন আইনি হয়রানির শিকার হয়েছেন। কুমিল্লার মুরাদনগরে বিএনপি নেতার করা এক হাজার কোটি টাকার মানহানি মামলায় এক সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলা ও ভাঙচুরের মামলায় দুই সাংবাদিককে আসামি করা হয়েছে। গাজীপুরে সরকারি জমি দখলের খবর প্রকাশের জেরে এক সাংবাদিক ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা হয়। রংপুরে সিআইডি কর্মকর্তার অনিয়ম নিয়ে তথ্য চাওয়ায় এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় অনিয়মের সংবাদ প্রকাশের পর এক ঠিকাদার মামলা করলেও পরে তা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
হুমকি ও কাজে বাধা: জুলাই মাসে কমপক্ষে ১৫ জন সাংবাদিক পেশাগত দায়িত্ব পালনে হুমকি, হেনস্তা ও কাজে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। কুমিল্লার লালমাইয়ে বিএনপি নেতার কাছ থেকে এক সাংবাদিক অকথ্য ভাষায় গালিগালাজের শিকার হন। দিনাজপুরের হিলিতে এক সাংবাদিককে জোর করে ‘স্যার’ বলতে বাধ্য করার চেষ্টা হয়। শরীয়তপুরের নড়িয়ায় এক সাংবাদিককে ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়। পঞ্চগড়ে একটি ব্যাংক কর্মকর্তার মাধ্যমে এক সাংবাদিককে প্রায় এক ঘণ্টা আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। নেত্রকোনার বারহাট্টায় উপজেলা পরিষদ চত্বরে এক সাংবাদিককে হেনস্তা এবং তার ধারণ করা তথ্য মুছে ফেলার অভিযোগও উঠেছে।
সাইবার হামলা: বিএজে জানায়, জুলাই মাসে একটি গণমাধ্যম সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ওয়ানের ফেসবুক পেজে পরিকল্পিত সাইবার হামলা চালানো হয়। ভুয়া কপিরাইট দাবি ও সমন্বিতভাবে রিপোর্ট করার মাধ্যমে ফেসবুক থেকে ওই প্রতিবেদনটি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে চ্যানেল কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে।
নিরাপদ কর্মপরিবেশের দাবি: বিএজে বলছে, সাংবাদিকদের ওপর ধারাবাহিক হামলা, মামলা, হুমকি ও সাইবার হয়রানি দেশের মুক্ত গণমাধ্যমের জন্য অশনিসংকেত। রাজনৈতিক প্রভাব বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সংগঠনটি প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।




