দেশের পানিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, খাদ্যনিরাপত্তা রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী ও শিক্ষাবিদেরা। তাঁদের মতে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বৈজ্ঞানিক মূল্যায়ন, ব্যয়সাশ্রয়ী ব্যবস্থাপনা এবং সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। পরিবেশগত, সামাজিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়ার পরামর্শ দেন তারা।
সোমবার বিকেলে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে ‘পদ্মা ব্যারাজ: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এ কথাগুলো বলেন বক্তারা। ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল কো-অপারেশন ফাউন্ডেশন (আইজিসিএফ) এই আলোচনার আয়োজন করে। সেখানে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী, শিক্ষাবিদ, উন্নয়নবিশেষজ্ঞ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন। আলোচনায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত ও জলবায়ুগত প্রভাব, পানি ব্যবস্থাপনা, কৃষি উৎপাদনশীলতা, খাদ্যনিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নের নানা দিক উঠে আসে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো অতিরিক্ত পানি ও পানির ঘাটতি—এই দুই চরম অবস্থার মধ্যে ওঠানামা। তিনি উল্লেখ করেন, এই ক্ষেত্রে একমাত্র যুগান্তকারী মাইলফলক হলো ১৯৭৭ সালে গৃহীত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি। এরপর নানা পরিকল্পনা এলেও সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় জনগণের চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে ব্যারাজের নকশা পরিবর্তন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ সম্পন্ন হলে দেশের জিডিপিতে অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যুক্ত হবে।
প্রধানমন্ত্রীর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ বলেন, তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে একটি মেগা প্রকল্প ছিল—পদ্মা ব্যারাজ। তিনি জানান, সরকার দ্রুত এই প্রকল্পের কাজ শুরু করবে এবং এ ক্ষেত্রে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি অনুসরণ করা হবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, অন্য কোনো দেশের হস্তক্ষেপ বা নজরদারি মেনে নেওয়া হবে না। জনগণের পানি সমস্যা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় যা কিছু প্রয়োজন, সরকার তা করবে।
গবেষণা সংস্থা দ্য ফাউন্ডেশন ফর স্ট্রাটেজিক অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (এফএসডিএস) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবর আঞ্চলিক পানিনিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করেন। তিনি উল্লেখ করেন, চীন ২০২৫ সালে ব্রহ্মপুত্রের উজানে একটি মেগা প্রকল্প শুরু করেছে, যা ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা। সেখানে ৬৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক পানিনিরাপত্তা ও ভূরাজনীতিতে এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে। তিনি ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেন।
আলোচনায় মডারেটরের দায়িত্ব পালন করেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড সোশিওলজি বিভাগের অধ্যাপক বুলবুল সিদ্দিকী। তিনি জানান, দেশের চারটি বিভাগ, ১৯টি জেলা এবং প্রায় সাত কোটি মানুষের কথা বিবেচনা করে ষাটের দশক থেকেই পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি এবং পদ্মা ব্যারাজ পরস্পর সম্পর্কযুক্ত। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো শুষ্ক মৌসুমে পর্যাপ্ত পানি সংরক্ষণ করতে না পারা। আবার পদ্মায় পানি থাকলেও অনেক শাখা নদীতে সেই পানি পৌঁছায় না। সরকারের নীতি প্রণয়নে সহায়ক সুপারিশ তৈরি করাই এই সংলাপের লক্ষ্য।
গোলটেবিলের আয়োজক আইজিসিএফ-এর চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান বলেন, পদ্মা ব্যারাজ শুধু একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প নয়; এর সঙ্গে পানিনিরাপত্তা, কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, নদীর প্রবাহ, পলি ব্যবস্থাপনা, সুন্দরবন, জীববৈচিত্র্য, আঞ্চলিক পানি কূটনীতি এবং বিপুল সরকারি বিনিয়োগের বিষয় জড়িত। সম্প্রতি একনেক নিজস্ব অর্থায়নে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির প্রথম ধাপ অনুমোদন করেছে। তিনি প্রকল্পটির সম্ভাবনার পাশাপাশি কারিগরি, পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকিও মূল্যায়নের আহ্বান জানান।
গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য নুরুল ইসলাম, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আব্দুল হান্নান চৌধুরী, সিভিল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম, অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. জাভেদ হোসেন, ঢাকা স্ট্রিমের সম্পাদক ইফতেখার মাহমুদ, জর্জিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির ডক্টরাল ফেলো ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী এবং র্যানকন ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা সুবাইল বিন আলম।



