রাতের খাবারের জন্য রেস্তোরাঁয় বসে মেনু কার্ডের সামনে দ্বিধাগ্রস্ত হওয়া—এমন অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই আছে। পরিচিত ও প্রিয় খাবারটি অর্ডার করবেন, নাকি নতুন কোনো আইটেম চেখে দেখবেন? এই চিরন্তন দোটানার সমাধান লুকিয়ে আছে গণিতের একটি চমৎকার সূত্রে, যার প্রবর্তক নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান।

১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকের ঘটনা। ক্যালিফোর্নিয়া ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পদার্থবিজ্ঞানী রিচার্ড ফাইনম্যান ও তাঁর বন্ধু রালফ লেইটন পাসাডেনার কাছে গ্লেনডেলের একটি থাই রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন। রালফ লেইটন অবশ্য সাধারণ কেউ নন—তিনি ১৯৬৪ সালের বিখ্যাত 'দ্য ফাইনম্যান লেকচার্স অন ফিজিক্স' বইয়ের সহলেখক রবার্ট লেইটনের ছেলে। পরে ১৯৮৫ সালে ফাইনম্যানের আত্মজীবনী 'শিওরলি ইউ আর জোকিং, মিস্টার ফাইনম্যান!' লিখতেও সহায়তা করেছিলেন তিনি। সেদিন রেস্তোরাঁয় বসে প্রিয় জিঞ্জার চিকেন নাকি অন্য কোনো নতুন খাবার—এই দ্বিধায় পড়েন লেইটন।

জাত বিজ্ঞানী ফাইনম্যান সবকিছুর ভেতরেই গণিতের সন্ধান পেতেন। বন্ধুর এই সংশয় দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে একটি কাগজে নানা গাণিতিক সূত্র লিখে ফেলেন এবং দাবি করেন, সমস্যার নিখুঁত সমাধান তিনি বের করে ফেলেছেন। ফাইনম্যানের মতে, একটি রেস্তোরাঁয় আপনি কতবার যাবেন, তার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট কয়েকবার নতুন খাবার চেখে দেখার পর আর ঝুঁকি না নিয়ে সবচেয়ে প্রিয় খাবারটি অর্ডার করাই বুদ্ধিমানের কাজ।

ফাইনম্যান সেদিন টেবিলে বসে যা সমাধান করেছিলেন, তা গণিত ও অর্থনীতির ভাষায় 'ডিসিশন থিওরি' নামে পরিচিত। অর্থনীতি ও মনস্তত্ত্বের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এই শাখা মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিশ্লেষণ করে। তাঁর সমাধানটি 'স্টপিং প্রবলেমস' বা 'থামার সমস্যা' নামে পরিচিত বৃহত্তর সমস্যাগুলোর একটি অংশ। উদাহরণস্বরূপ, শপিং মলে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য প্রথম ফাঁকা জায়গাটি ব্যবহার করবেন নাকি লিফটের কাছাকাছি আরও ভালো জায়গা খুঁজবেন—এই দোটানাও একই ধরনের সমস্যা। আরও ভালো কিছুর আশায় খোঁজ চালানো এবং যা পেয়েছি তা ব্যবহার করার এই চিরন্তন লড়াইকেই 'স্টপিং প্রবলেম' বলে।

ফাইনম্যানের সেই হিজিবিজি লেখা কাগজটি যত্ন করে রেখেছিলেন রালফ লেইটন। ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে তিনি সেটির পাঠোদ্ধারের চেষ্টা করে অনলাইনে প্রকাশ করেন। এরপর ২০১৩ সালে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির গবেষক টম গ্রিফিথস ও ব্রায়ান ক্রিশ্চিয়ান ফাইনম্যানের নোটগুলোর পূর্ণাঙ্গ পাঠোদ্ধার করেন। কিন্তু বিষয়টি সেখানে থেমে ছিল প্রায় এক দশক। ২০২১ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলের গবেষক ক্রিশ্চিয়ান ও তাঁর দল সিদ্ধান্ত নেন, ফাইনম্যানের সূত্রের বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা চালাবেন।

গবেষকরা ফাইনম্যানের গাণিতিক সমাধানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের আচরণের মিল আছে কি না, তা যাচাই করার জন্য সিটি ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের মনস্তত্ত্ববিদ ইভান রুসেকের সঙ্গে মিলে একটি অনলাইন গেম তৈরি করেন। এই গবেষণায় অংশ নেন মোট ২ হাজার ৫২০ জন স্বেচ্ছাসেবী। তাঁদের বলা হয়েছিল, একটি নতুন শহরে এক থেকে চার সপ্তাহ অবস্থান করবেন এবং প্রতি রাতে কোন রেস্তোরাঁয় খাবেন তা ঠিক করতে হবে। বেছে নেওয়া রেস্তোরাঁর মানের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের ১ থেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে পয়েন্ট দেওয়া হবে।

ফলাফলে গবেষকরা অবাক হয়ে দেখেন, অংশগ্রহণকারীরা অবচেতনভাবেই ফাইনম্যানের সূত্রের কাছাকাছি কৌশল অবলম্বন করছেন। সফরের শুরুতে, যখন হাতে অনেক দিন বাকি, তখন তাঁরা নতুন নতুন রেস্তোরাঁ খুঁজে দেখার ঝুঁকি নিচ্ছিলেন; কিন্তু সফরের শেষ দিকে নতুন খোঁজার প্রবণতা কমে গিয়ে খুঁজে পাওয়া সেরা রেস্তোরাঁতেই বারবার খেতে শুরু করেন। এই গবেষণার ফল গত ১ জুন 'প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস' জার্নালে প্রকাশিত হয়। মজার ব্যাপার হলো, অংশগ্রহণকারীদের কেউই বর্গমূলের জটিল গাণিতিক সূত্র কষেননি, তবু মানুষের মস্তিষ্ক স্বজ্ঞাতভাবেই প্রায় নিখুঁত গাণিতিক পথে হেঁটেছে।

তবে এই নিখুঁত গাণিতিক মডেলেও একটি ছোট ফাঁক আছে। শোহাম চোশেন-হিলেলের মতে, ফাইনম্যানের গণিত বলে, একবার সেরা খাবার খুঁজে পেলে সারাজীবন শুধু সেটাই অর্ডার করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে রোজ একই খাবার খেলে দ্রুতই বিতৃষ্ণা চলে আসে, যা গাণিতিক মডেল ধরে না। গবেষক ক্রিশ্চিয়ান অবশ্য মনে করেন, এই মডেলের মূল উদ্দেশ্য মানুষের প্রতিটি আচরণ মাপা নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের মৌলিক টানাপোড়েন—নিরাপদ, পরিচিত জিনিস নিয়ে থাকা নাকি নতুনের স্বাদ নিতে ঝুঁকি নেওয়া—এই দ্বন্দ্ব প্রকাশ করা। গণিত হয়তো খাবারের স্বাদ বলে দেবে না, তবে জীবনের কোন পর্যায়ে নতুনের খোঁজ থামিয়ে পাওয়া জিনিস নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা উচিত, তার হিসাব দিতে পারে।