কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী স্টেশন চত্বরে শনিবার দুপুরে কয়েকশ আমানতকারী সমবেত হন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল আল-আরাফাহ্ ইসলামী ব্যাংকের স্থানীয় এজেন্ট শাখা থেকে নিখোঁজ হওয়া কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আত্মসাৎ হওয়া টাকা ফেরত পাওয়া। বেলা দুইটার দিকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির একপর্যায়ে সড়কে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই অবরোধ বিকেল পাঁচটার দিকে পুলিশের আশ্বাসে প্রত্যাহার করা হয়।
সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন স্থানীয় মাংস ব্যবসায়ী মো. শাহজাহান। তিনি ওই শাখায় নয় লাখ টাকা জমা রেখেছিলেন বলে তাঁর এক আত্মীয় জানিয়েছেন। টাকা হারানোর শোকে দিশাহারা হয়ে পড়েন শাহজাহান। প্রতিবাদের মধ্যেই তিনি হঠাৎ মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং জ্ঞান হারান। তাঁর আত্মীয়ের ভাষ্য, এটি ছিল তাঁর সারা জীবনের সঞ্চয়, যা হারিয়ে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন।
অবরোধের ফলে কক্সবাজার-টেকনাফ এবং টেকনাফ-কক্সবাজারমুখী শত শত যানবাহন আটকে পড়ে। যাত্রীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘প্রতারকের বিচার চাই’, ‘আমাদের টাকা ফেরত চাই’—এমন স্লোগানে মুখরিত করে তোলেন এলাকাটিকে। অনেক আমানতকারী আবেগে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা যায়, পালংখালী বাজারে অবস্থিত ওই এজেন্ট শাখায় দীর্ঘ সাত বছর ধরে গ্রাহকরা নিয়মিত টাকা জমা ও উত্তোলন করতেন। সম্প্রতি টাকা তুলতে গেলে হিসাবের গরমিল ধরা পড়ে। শাখার ম্যানেজার ও ক্যাশিয়াররা নানা অজুহাত দেখিয়ে অর্থ ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান। গ্রাহকরা টাকা চাওয়ার জন্য ভিড় জমাতে শুরু করলে গত ১৭ আগস্ট শাখার সবাই উধাও হয়ে যান। অভিযোগ উঠেছে, কর্মকর্তারা গ্রাহকদের অন্তত দশ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছেন।
আইনগত পদক্ষেপের অংশ হিসেবে গত ১৭ আগস্ট ২১ জন গ্রাহকের পক্ষে আনোয়ার ফয়সাল আরিফ বাদী হয়ে ব্যাংকটির নয়জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। কক্সবাজার আদালতেও ক্ষতিগ্রস্তরা পৃথকভাবে পাঁচটি মামলা করেছেন। আরও অনেকে মামলা প্রস্তুত করছেন। পুলিশ ১৮ আগস্ট এজেন্ট মালিক হাকিম উদ্দিন ও ক্যাশিয়ার তাহসিন ইসলামকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবাদ সভায় ব্যবসায়ী আনোয়ার ফয়সাল আরিফ জানান, তাঁর হিসাবে পাঁচ লাখ পঞ্চান্ন হাজার টাকা জমা ছিল। দীর্ঘদিনের লেনদেনের পর হঠাৎ দেখা যায় হিসাবে টাকা নেই। তাঁর অভিযোগ, এটি কোনো একক ব্যক্তির কাজ নয়; বরং একটি সংঘবদ্ধ চক্র গ্রাহকদের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে পালিয়েছে। তিনি টাকা ফেরত ও জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকটির পালংখালী শাখার কর্মকর্তারা কয়েকশ গ্রাহকের অন্তত দশ কোটি টাকা নিয়ে উধাও হয়েছেন। মামলার পর দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। বর্তমানে ব্যাংকটি তালাবদ্ধ। চাবি পালংখালী বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে জমা রাখা হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, এজেন্ট শাখা থেকে গ্রাহকের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাতের বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। গ্রাহকরা যেন নিজেদের আমানত ফিরে পান, সে লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। এদিকে শাহজাহানের মতো আরও অনেকের জীবন সঞ্চয় হারানোর বেদনায় এলাকাজুড়ে শোক ও ক্ষোভের ছায়া পড়েছে।




