পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের খুঁটিনাটি সব তথ্য — বাস্তবায়ন-সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনসহ — জনগণের সামনে উন্মুক্ত করার জোর দাবি উঠেছে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞ মহল থেকে। তাঁদের বক্তব্য, বিপুল অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়ন হতে যাওয়া এই ‘সুপার মেগা’ প্রকল্প সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়া হয়নি। রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিতের সাম্প্রতিক যে দাবি, তার সঙ্গে এই গোপনীয়তা একেবারেই সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেন তাঁরা। প্রকল্পের সমস্ত তথ্য ওয়েবসাইটে প্রকাশের পাশাপাশি সংসদের পানিসম্পদবিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে প্রকাশ্য গণশুনানি আয়োজনেরও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। শনিবার সকালে রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘গঙ্গা (পদ্মা) ব্যারাজ: কতিপয় প্রশ্ন ও প্রস্তাব’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব দাবি তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ নেটওয়ার্ক (বেন) যৌথভাবে এই সভার আয়োজন করে।
চলতি বছরের মে মাসে সরকার পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়) নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়, যার মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারিত রয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় পদ্মা নদীর ওপর ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মূল বাঁধ নির্মাণ করা হবে। সরকারের দাবি, পদ্মার ওপর নির্ভরশীল দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ জমির পানিসংকট মেটাতেই এই উদ্যোগ। পানিপ্রবাহ বৃদ্ধির মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার ফলে সুন্দরবন অঞ্চলের লবণাক্ততা কমবে, জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য রক্ষা পাবে এবং কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এশীয় প্রবৃদ্ধি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও বাপার সহসভাপতি নজরুল ইসলাম, যেখানে প্রকল্পটি নিয়ে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়। প্রবন্ধে বলা হয়েছে, শুষ্ক মৌসুমে ব্যারাজ থেকে ৬৯৮ কিউমেক পানি সরবরাহের যে দাবি করা হচ্ছে, তার মাত্র ৩০ শতাংশ আসবে সঞ্চিত পানি থেকে। বাকি ৭০ শতাংশ পানি সরবরাহের জন্য গঙ্গার চলতি প্রবাহের ওপর নির্ভর করতে হবে, অর্থাৎ পাংশার ভাটি এলাকা থেকে পানি সরিয়ে এনে এই যোগান নিশ্চিত করতে হবে। এর ফলে পাংশার উজান ও ভাটি অঞ্চলের মধ্যে পানির প্রবাহ ৬০:৪০ অনুপাতে বিভক্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মূল সমস্যা পানির অপ্রতুলতা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতা। এর জন্য প্রধানত পোল্ডার ও বেড়িবাঁধ দায়ী। কিন্তু প্রকল্পের সম্ভাব্যতা প্রতিবেদনে এই জলাবদ্ধতা সমস্যার কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান নেই বলেই অভিমত প্রকাশ করা হয়। কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির যে প্রক্ষেপণ দেখানো হয়েছে, তাকে ‘রঙিন ভবিষ্যৎ চিত্র’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানিবণ্টন চুক্তির প্রসঙ্গও প্রবন্ধে তুলে ধরা হয়েছে। চলতি বছরেই এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। চুক্তি নবায়নের আগে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণে এগোলে আন্তর্জাতিক পানিবণ্টন আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করা হয়। বৈদেশিক ঋণের বোঝা ইতিমধ্যেই উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, এমন পরিস্থিতিতে ৩৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্প কতটা যৌক্তিক — সে প্রশ্নও তোলা হয়েছে।
তবে নজরুল ইসলামের প্রবন্ধে উপস্থাপিত তথ্যকে ‘একপেশে’ বলেই মন্তব্য করেছেন পানি ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ মালিক এ ফিদা খান। তাঁর মতে, প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য জনসমক্ষে না আসার কারণেই এই ধরনের একপেশে বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তিনি প্রকল্পের সম্পূর্ণ সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট সবার কাছে প্রকাশের জোর দাবি জানান। বাপার সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির জানান, প্রকল্পের প্রয়োজনীয় নথিপত্র চেয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে লিখিতভাবে জানানো হলেও তাঁরা সেগুলো পাননি। এমনকি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নিয়ে কেন এই লুকোচুরি, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মতামত উঠে আসে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক মো. শাহজাহান কবীর পলি ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। গঙ্গা-পদ্মা অত্যন্ত পলিবাহী নদী উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ নদীতে ব্যারাজ নির্মাণ করলে বিপুল পরিমাণ পলি আটকে যেতে পারে, যা অপসারণ করা হবে অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। অন্যদিকে, সমালোচনাগুলো বিবেচনায় নিয়েই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন কৃষি অর্থনীতিবিদ জাহাঙ্গীর আলম খান। তাঁর মতে, এই উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করা ঠিক হবে না; বরং পরিবেশসহ অন্যান্য বিষয়ে যে সমালোচনা উঠেছে, সেগুলো যথাযথভাবে আমলে নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা উচিত। এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় সাত কোটি মানুষ সুফল পেতে পারেন। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বিশ্বে এক লাখের বেশি ব্যারাজ রয়েছে এবং খাদ্য উৎপাদনের জন্য এখনো ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা আছে। কৃষির জন্য শুধু বৃষ্টির ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন। পদ্মায় ব্যারাজ নিয়ে পরিবেশবিদদের আপত্তি থাকলেও এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিবেচনায় নেওয়ার পাশাপাশি ব্যারাজের বিকল্প কী হতে পারে, সেটিও ভাবার পরামর্শ দেন তিনি।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাপার সভাপতি নুর মোহাম্মদ তালুকদার। স্বাগত বক্তব্য দেন বাপার সহসভাপতি অধ্যাপক এম ফিরোজ আহমেদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন বাপার সহসভাপতি খুশি কবীর, ভূতত্ত্ববিদ আহাদ চৌধুরী, রিভারাইন পিপলের মহাসচিব শেখ রোকন প্রমুখ। সভায় আরেকটি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেনের বৈশ্বিক সমন্বয়কারী মো. খালেকুজ্জামান।




