ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ এবং মাস্টার অব ট্যাক্স ম্যানেজমেন্ট (এমটিএম) অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ উদ্যোগে ‘প্রায়োগিক আয়কর ও ই-রিটার্ন দাখিল’ বিষয়ক তিন দিনব্যাপী একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালা শুরু হয়েছে। শনিবার বেলা দুইটায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ভবনের অধ্যাপক আবদুল্লাহ ফারুক মাল্টিপারপাস হলে এই কর্মশালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন সম্পন্ন হয়। অনুষ্ঠানে বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ কর্মশালার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এই আয়োজনের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান ইকতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন। এ ছাড়া সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসির পরিচালক ফৌজিয়া কামরুন তানিয়াও অনুষ্ঠানে অংশ নেন। কর্মশালার মূল স্লোগান নির্ধারণ করা হয়েছে—‘শিখুন। চর্চা করুন। আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাখিল করুন’।

প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে অর্থ আইন, ২০২৬-এর সাম্প্রতিক সংশোধনী ও তার প্রভাব, ই-রিটার্ন জমা দেওয়ার পদ্ধতি, কর সম্মতি নিশ্চিতকরণ, উৎসে কর কর্তন (টিডিএস), অগ্রিম আয়কর (এআইটি), নিরীক্ষা এবং মামলা পরিচালনার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকার, অর্থ ও হিসাবসংক্রান্ত পেশাজীবী, উদ্যোক্তা এবং কর প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা; তাদের জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

উদ্বোধনী পর্বে স্বাগত ভাষণ প্রদান করেন অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম জাহিদ। তিনি জানান, বিভাগের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অংশ হিসেবে এই কর্মশালার আয়োজন করা হয়েছে। নাগরিক হিসেবে আয়কর প্রদান একটি দায়িত্ব হলেও রিটার্ন দাখিলের প্রক্রিয়া অনেকের কাছে জটিল মনে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর প্রত্যাশা, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীদের বিদ্যমান জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক দক্ষতা ও নতুন ধারণা যুক্ত হবে।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান ইকতিয়ারউদ্দিন মো. মামুন তাঁর বক্তব্যে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করেন। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন চাপে অর্থনীতি একটি নিম্ন ভারসাম্যের অবস্থায় রয়েছে। রাজস্ব সংগ্রহ, কর-জিডিপি অনুপাত এবং জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থা থেকে অর্থনীতিকে পুনরায় গতিশীল করতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে স্থবির রেখে জোরপূর্বক রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব নয়। বরং প্রথমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল করতে হবে এবং একই সঙ্গে করদাতাদের মধ্যে কর প্রদানের দায়বদ্ধতা ও পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, করদাতাদের সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে স্বেচ্ছায় রাজস্ব প্রদানের প্রবণতাও বাড়বে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি কর-সচেতনতা ও রাজস্ব আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মাহমুদ ওসমান ইমাম বলেন, আয়কর ও ই-রিটার্ন বিষয়ে এই ধরনের কর্মশালা অত্যন্ত সময়োপযোগী। তবে শুধু ই-রিটার্ন ফরম পূরণের কৌশল শেখানোই যথেষ্ট নয়; করের পরিবর্তিত নিয়ম ও তার বাস্তব প্রভাব সম্পর্কে করদাতা ও কর পেশাজীবীদের গভীর ধারণা থাকা প্রয়োজন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, কর পেশাজীবীদের দায়িত্ব কেবল ক্লায়েন্টের রিটার্ন ফরম পূরণে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আইনের আওতায় থেকে কীভাবে ক্লায়েন্টের কর ব্যবস্থাপনা করা যায়, সে বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দেওয়াও তাদের কাজ। কর ব্যবস্থাপনা ও কর ফাঁকির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে—এই বিষয়টি বুঝে ক্লায়েন্টকে তার আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে পরিকল্পনা দিতে হবে। একজন দক্ষ কর পেশাজীবীকে প্রতিটি তথ্য ও ফরম পূরণের প্রভাব সম্পর্কে ক্লায়েন্টকে অবহিত করতে হবে। এর ফলে ক্লায়েন্টের আস্থা গড়ে উঠবে এবং কর পেশাজীবীদের কাজ আরও অর্থবহ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, ক্লায়েন্টের আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে কর পরিকল্পনা করতে হলে পেশাজীবীদের আইনের গভীর জ্ঞান থাকা অপরিহার্য।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সোনালী লাইফ ইনস্যুরেন্স পিএলসির পরিচালক ফৌজিয়া কামরুন তানিয়া, বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা শেখ এবং এমটিএম অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মুসতবা ইশতিয়াক আহমদ। তিন দিনের এই কর্মশালা ২২ আগস্ট ছাড়াও ২৮ ও ২৯ আগস্ট বেলা দুইটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। ২৯ আগস্ট তৃতীয় দিনের সেশনের সমাপ্তিতে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সনদ বিতরণ করা হবে।