ওজন, বয়স এবং লিঙ্গের ভিত্তিতে একজন মানুষের দেহে রক্তের পরিমাণ ভিন্ন হয়ে থাকে। একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দেহের মোট ওজনের আনুমানিক ৭ থেকে ৮ শতাংশ জুড়ে থাকে রক্ত, যার পরিমাণ গড়ে সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ লিটারের মধ্যে হয়। পুরুষদের শারীরিক গঠন ও পেশির আয়তনের জন্য তাঁদের রক্তের পরিমাণ নারীদের চেয়ে কিছুটা বেশি, প্রায় ৫ থেকে ৬ লিটার। নারীদের ক্ষেত্রে তা হয় ৪.৫ থেকে ৫ লিটার। বয়স বাড়ার সঙ্গে রক্তকণিকা তৈরির প্রক্রিয়া ও দেহকোষের গঠনে পরিবর্তন আসে।
বয়সভেদে রক্তের পরিমাণেও পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। একজন নবজাতকের দেহে প্রতি কেজি ওজনে ৭৫ থেকে ১০০ মিলিলিটার করে রক্ত থাকে এবং জন্মের সময় দেহের অনুপাতে রক্তের ঘনত্ব বেশি থাকে। শিশুদের দ্রুত বৃদ্ধির জন্য বাড়তি রক্ত সরবরাহ জরুরি, ফলে তাদের দেহের ৮ থেকে ৯ শতাংশই রক্ত। অন্যদিকে, গর্ভবতী নারীরা ভ্রূণের পুষ্টি ও অক্সিজেন চাহিদা মেটাতে প্লাজমার আয়তন বাড়িয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত রক্ত উৎপাদন করতে পারেন।
দেহের অভ্যন্তরীণ কার্যপ্রণালিতে রক্ত এক অনন্য ভূমিকা পালন করে। ফুসফুস থেকে গৃহীত অক্সিজেন হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে ধারণ করে রক্ত তা কোটি কোটি কোষে পৌঁছে দেয়। পরিপাকতন্ত্র থেকে শোষিত গ্লুকোজ, অ্যামিনো এসিড ও ভিটামিন সরবরাহ করার পাশাপাশি, কোষের বিপাকে সৃষ্ট ক্ষতিকর বর্জ্য কুড়িয়ে তা ফুসফুস ও বৃক্কে পৌঁছে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত নিঃশ্বাস ও মূত্রের সঙ্গে নির্গত হয়। রোগ নিরাময়ে শ্বেত রক্তকণিকা ও অ্যান্টিবডি অনবরত প্রহরায় থাকে এবং বাহিরের ভাইরাস বা ব্যাক্টেরিয়াকে ধ্বংস করে। গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোনসমূহ লক্ষ্য-অঙ্গে প্রেরণ, দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি ও অম-ক্ষারের ভারসাম্য রক্ষণাবেক্ষণ করাও রক্তেরই দায়িত্ব।
যদিও দেহের নিজস্ব পুনরুদ্ধারক্ষমতা আছে, তবুও কতটা রক্ত হারালে তা মারণ হতে পারে, সে বিষয়ে ধারণা রাখা জরুরি। একজন ব্যক্তি তাঁর দেহের মোট রক্তের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারানোর পরও স্বাভাবিকভাবে তা সামলে নিতে সক্ষম। এই হিসাবে, ৫ লিটার রক্ত থাকলে ৫০০ থেকে ৭৫০ মিলিলিটার রক্তক্ষরণ দেহ সমন্বয় করতে পারে। কিন্তু ২০ থেকে ৩০ শতাংশ রক্ত বের হয়ে গেলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, তখন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। রক্তক্ষরণ মোট রক্তের ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে, অর্থাৎ ২ লিটার বা তার বেশি রক্ত হারালে, তা প্রাণসংশয়ী হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না দেওয়া গেলে এই অবস্থা মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে।
সাধারণত রক্তদান অনুষ্ঠানে ৪৫০ মিলিলিটার রক্ত নেওয়া হয়, যা মোট রক্তের ১০ শতাংশেরও কম। দান দেওয়ার পর দ্রুতই প্লাজমা ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পুনরুদ্ধার হয়। যদিও লোহিত রক্তকণিকা সম্পূর্ণরূপে তৈরি হতে ৪ থেকে ৮ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হয়।




