ফিটনেস বলতে ঘাম ঝরানো ও কঠোর শরীরচর্চার চিরায়ত সংজ্ঞা এখন বদলে যাচ্ছে। বিশ্বজুড়ে নতুন করে নজর কাড়ছে ‘তাইচি ওয়াকিং’, যা চলমান ধ্যান হিসেবেও পরিচিত। এটি ধীর, সচেতন এবং মনোযোগী হয়ে হাঁটার একটি বিশেষ অনুশীলন, যা দেহকে সচল রাখার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক চাপ কমাতে ও একটি স্বাস্থ্যকর জীবনধারা গড়ে তুলতে সহায়ক।

ভোরের নরম আলোয় পার্কের পথে কয়েকজন মানুষের ধীরে ধীরে হাঁটার চিত্র বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ লাগলেও, প্রতিটি কদমের নিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস, দেহের ভারসাম্য আর গভীর মনোযোগ একে আলাদা করে তোলে। এখন মানুষ শুধু শারীরিক নয়, মানসিক আরামও খুঁজছেন, আর সে কারণেই এই প্রাচীন কৌশলটি আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

প্রায় সাতশ বছর আগে চীনের প্রাচীন মার্শাল আর্ট ‘তাই চি চুয়ান’ থেকে এর সূত্রপাত হয়। এখানে গতি নয়, মূল বিষয় হলো দেহের ওজন ধীরে ধীরে এক পা থেকে আরেক পায়ে স্থানান্তর এবং গভীর ও ছন্দময় শ্বাস নেওয়া। এই প্রক্রিয়া মনকে বর্তমান মুহূর্তে স্থির রাখে, ফলে একে ‘চলমান ধ্যান’-ও বলা হয়।

করোনা মহামারির পর দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, উদ্বেগ আর ঘুমের সমস্যা অনেকের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বাস্তবতায় তাইচি ওয়াকিং একটি সহজ, নিরাপদ এবং কম কসরতের অনুশীলন হিসেবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এটি যদিও উচ্চমাত্রার কার্ডিও ব্যায়াম নয় এবং দৌড়ানো বা দ্রুত হাঁটার সমান ক্যালোরি পোড়ায় না, তবুও নিয়মিত অভ্যাস করলে দেহ সক্রিয় রাখে, পেশি সচল করে, দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার অভ্যাস হ্রাস করে ও মানসিক চাপ কমিয়ে অতিভোজনের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে।

বিশ্নেষকরা অভিমত দেন, সুষম খাদ্যের সাথে নিয়মিত এই হাঁটা দীর্ঘমেয়াদে ওজন নিয়ন্ত্রণ সহজ করে দিতে পারে। বিভিন্ন গবেষণাতেও পাওয়া গেছে, নিয়মিত তাইচি চর্চা দেহের ভারসাম্য উন্নত করা, পতনের আশঙ্কা হ্রাস, হাঁটুর কার্যক্ষমতা বাড়ানো, মানসিক চাপ কমানো, ঘুমের মানোন্নয়ন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ও দেহের নমনীয়তা বাড়ানোর মতো উপকার করে। বিশেষত বয়স্ক নাগরিকদের জন্য এটি সবচেয়ে নিরাপদ ব্যায়ামগুলোর একটি হিসাবে বিবেচিত হয়।

এই হাঁটা শুরু করতে কোনও যন্ত্রপাতির প্রয়োজন পড়ে না। শুরু করার পদ্ধতি সহজ: প্রথমে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে কাঁধ ও ঘাড় শিথিল করে ধীরে গভীর শ্বাস নিতে হবে। একটি পা খুব ধীরে এগিয়ে প্রথমে গোড়ালি ও পরে সম্পূর্ণ পা মাটিতে বসিয়ে দেহের ওজন সামনের পায়ে স্থানান্তর করতে হয়। একই পদ্ধতিতে পরের পা সামনে আনতে হয় এবং প্রতিটি পদক্ষেপের সময় শ্বাস-প্রশ্বাস ও ভারসাম্যে মনোযোগ দিতে হয়। প্রথমে ১০ মিনিট থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়িয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিটে নেওয়া যায়।

দৌড়ানো বা লাফের তুলনায় এই অনুশীলনে হাঁটু, কোমর ও গোড়ালির সন্ধির ওপর চাপ অনেকটাই কম পড়ে, ফলে যাদের সন্ধিস্থলে অস্বস্তি রয়েছে তাদের জন্য এটি উপযোগী। ধীর গতি ও গভীর শ্বাস স্নায়ুতন্ত্রকে শিথিল রাখতে পারে, যা উদ্বেগ কমাতে সহায়ক। এটি দেহের ভঙ্গি ঠিক করে এবং কোর পেশিকে সক্রিয় রাখার অভ্যাস গড়ে তোলে। পাশাপাশি, দেহে নমনীয়তা ও রক্ত সঞ্চালন বাড়াতেও ভূমিকা রাখে।

যারা প্রথমবার ব্যায়াম করছেন, পঞ্চাশোর্ধ্ব ব্যক্তি, দীর্ঘক্ষণ ডেস্কে বসে কাজ করেন, মানসিক চাপে ভোগেন অথবা অস্ত্রোপচারের পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাইছেন— সকলের জন্যই এটি বিশেষভাবে উপযোগী। ভোর বা বিকেলের নরম আলোয় পার্ক, লেকপাড় কিংবা বাগানের মতো খোলা জায়গায় এটি করা আদর্শ। তবে ভারসাম্যের সমস্যা থাকলে দেয়ালের পাশে অনুশীলনের পরামর্শ দেওয়া হয় এবং হৃদরোগ বা স্নায়বিক সমস্যার ইতিহাস থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বর্তমানের দ্রুতগতির জীবনে আমরা প্রায়ই নিজেদের সাথে যোগসূত্র হারিয়ে ফেলি। ১৫ থেকে ২০ মিনিটের এই ধীর হাঁটা হয়তো ব্যাপক ক্যালোরি পোড়ায় না, কিন্তু এটি যদি আপনাকে দৈনন্দিন প্রশান্তি ও শরীরচর্চার অভ্যাস গড়তে সহায়তা করে, তবে তাই হতে পারে সুস্থ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান একটি কদম।