দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনাঞ্চলে দেখা দিয়েছে তীব্র খাদ্য সংকট। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবারের প্রয়োজন হলেও, সেই চাহিদা পূরণে দিনের ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা খাবারের সন্ধানে কাটাতে হয়। ঘাস, বাঁশ, বেত, নলখাগড়া, লতাপাতা, গুল্ম, কচি ডাল, গাছের বাকল, বুনো কলাসহ ১০০ থেকে ৫০০ প্রজাতির উদ্ভিদ তাদের খাদ্যতালিকায় থাকলেও বন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে এসব খাদ্য উৎস। ফলে প্রকৃতির বিশাল এই প্রাণীটি বাধ্য হয়ে চলে আসছে মানুষের ফসলের মাঠে।
লোহাগাড়ার চুনতির কৃষক আবু সিদ্দিক এই বাস্তবতার একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিন মাস আগে এক সন্ধ্যায় তিনটি বন্য হাতি তার জমির পরিচর্যা করা লাউ, মুলা, কলাসহ নানা ফসল কয়েক মিনিটেই মাড়িয়ে যায়। তবে তিনি হাতিকে দোষ দেন না। তাঁর মতে, বনে খাবার কমে যাওয়ায় হাতিরা এখন ঘন ঘন লোকালয়ে নেমে আসছে; বনে পর্যাপ্ত খাবার থাকলে তারা মানুষের জমিতে নামত না।
চুনতি সংরক্ষিত বনে গিয়ে দেখা যায়, হাতির নিয়মিত খাবারের জায়গা হিসেবে পরিচিত একটি বাঁশবাগানের প্রায় এক একর অংশ উজাড় করা হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন স্থানে হাতির বিষ্ঠা ও পায়ের ছাপ রয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বুনো হাতির দল সেখানে কচি বাঁশ খেতে আসত। শুধু চুনতি নয়, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন বনে হাতির খাদ্যের উৎস কমছে এবং আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংকুচিত হচ্ছে। বন বিভাগের নথি ও গবেষকদের মতে, বনের ভেতরে স্বাভাবিক খাবারের ঘাটতিই হাতির লোকালয়ে নেমে আসার অন্যতম প্রধান কারণ।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ তাঁর 'বিপন্ন হাতির কথা' বইয়ে উল্লেখ করেছেন, একটি হাতির খাদ্যতালিকা তার আবাসস্থলের উপর নির্ভরশীল। বনে উদ্ভিদের বৈচিত্র্য বেশি থাকলে খাবারও বেশি মেলে। একটি পূর্ণবয়স্ক হাতির দৈনিক ১৫০ থেকে ২০০ কেজি খাবারের পাশাপাশি ২০০ লিটারের বেশি পানির প্রয়োজন হতে পারে। তাই শুধু বড় গাছে ঢাকা বন হাতির জন্য যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বাঁশঝাড়, বেত, নলখাগড়া, লতাপাতা, গুল্ম, বুনো কলা, খোলা জায়গা, ছড়া ও জলাশয় সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় বন।
অধ্যাপক আজিজ বলেন, হাতি বড় গাছের ঘন বন তেমন পছন্দ করে না। তাদের প্রয়োজন লতাপাতা, বাঁশ, কলাগাছ, নলখাগড়া ও ঝোপঝাড়। কিছু গাছ, কিছু খোলা জায়গা এবং পানির উৎস আছে—এমন বন হাতির জন্য বেশি উপযোগী। কিন্তু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বনগুলোতে সেই পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। স্থানীয় মানুষ বাঁশ, বেত, লতাপাতা ও অন্যান্য উদ্ভিদ সংগ্রহ করছেন, নির্বিচার চরানো হচ্ছে গরু-ছাগল। কোথাও জঙ্গল পরিষ্কার করে একক প্রজাতির বাণিজ্যিক গাছ লাগানো হচ্ছে, আবার কোথাও গড়ে উঠছে বসতি, কৃষিজমি ও নানা স্থাপনা।
বাংলাদেশের বনে থাকা এশীয় হাতির বৈজ্ঞানিক নাম ইলিফাস ম্যাক্সিমাস। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) প্রজাতিটিকে বিপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। বন বিভাগ ও আইইউসিএনের জরিপ অনুযায়ী, দেশে স্থায়ী বন্য হাতি রয়েছে ২১০ থেকে ৩৩০টি, যাদের অধিকাংশের বাস চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে। তবে এই হিসাবও হালনাগাদ নয়।
গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচের স্যাটেলাইটভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে ১২ লাখ হেক্টর প্রাকৃতিক বন ছিল। ২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই বিভাগে প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর বৃক্ষ আচ্ছাদন হারিয়েছে, যা ২০০০ সালের বৃক্ষ আচ্ছাদনের প্রায় ২০ শতাংশ। একই সময়ে আর্দ্র প্রাথমিক বন কমেছে প্রায় ৮ হাজার ৮০০ হেক্টর। প্রাথমিক বন কমে যাওয়া এবং বনের অবক্ষয় হাতির খাদ্য ও আবাসের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
বনের এক অংশে খাবার কমে গেলে হাতির দল অন্য বনে চলে যায়, ঋতুবদলের সঙ্গে বদলে যায় তাদের খাদ্যের উৎসও। এই চলাচলের নির্দিষ্ট পথই হাতির করিডর; কিন্তু দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের অনেক করিডর এখন আর আগের মতো খোলা নেই। কোথাও বসতি, কোথাও কৃষিজমি, কোথাও সড়ক ও রেললাইন হাতির পথ আটকে দিয়েছে। টেকনাফ-উখিয়া এলাকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির গড়ে ওঠার পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর বন্ধ হয়ে গেছে। আইইউসিএনের জরিপের ভিত্তিতে দেশে ১২টি হাতির করিডর চিহ্নিত করা হয়েছিল; কিন্তু অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, এর অধিকাংশই এখন বাধাগ্রস্ত বা দখল হয়ে গেছে। এক দশকেও এসব করিডরের হালনাগাদ মূল্যায়ন হয়নি।
করিডর সংকুচিত হওয়ার প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনেও। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে হাতি। সর্বশেষ গত ২৬ জুলাই রাতে আনোয়ারা উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের গুয়াপঞ্চক মাহমুদুল্লাহপাড়ায় একটি বন্য হাতি চারটি বসতঘর ভেঙে ফেলে এবং বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে। ক্ষতিগ্রস্ত ওসমান গণি জানান, রাতের অন্ধকারে হাতিটি ঘরের দেয়াল ভেঙে ওঠানের ফসল মাড়িয়ে দেয়। বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, বনে হাতির খাবার কমে যাওয়ায় লোকালয়ে নেমে আসার প্রবণতা বাড়ছে। তাঁর বিভাগের আওতাধীন এলাকায় গত তিন বছরে হাতির আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত ৪১৮ জনকে ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করিডর হারানোর ক্ষতি শুধু সংঘাতেই সীমাবদ্ধ নয়। এক বন থেকে আরেক বনে যেতে না পারলে হাতির দল ছোট ছোট এলাকায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যার ফলে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। হাতি একটি 'কিস্টোন স্পিসিজ' বা বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতি। বনের ভেতর চলাচলের সময় তারা ঝোপঝাড়ে পথ তৈরি করে, বুনো ফল খেয়ে দূরে দূরে বীজ ছড়িয়ে দেয়। তাদের তৈরি পথ ব্যবহার করে হরিণ, বন্য শূকরসহ অনেক বন্য প্রাণী চলাচল করে। তাই হাতির সংখ্যা কমে গেলে সেই বনের স্বাভাবিক পুনর্জন্ম ও জীববৈচিত্র্যও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেও ফিরে আসে।
চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির, নতুন সড়ক নির্মাণ ও জনবসতি সম্প্রসারণের কারণে হাতির আবাসস্থল ও খাদ্যের উৎস সংকুচিত হচ্ছে। এ সংকট মোকাবিলায় চুনতি বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যসহ বিভিন্ন এলাকায় বাঁশ ও হাতির খাদ্যোপযোগী দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানো হচ্ছে এবং জলাধার তৈরি করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিনের দখলদার উচ্ছেদ বা রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের মতো বড় বাস্তবতার সমাধান নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন মনে করেন, বনে হাতি পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে না। হাতির জন্য উপযোগী বনে বাঁশঝাড়, বেত, নলখাগড়া, ঝোপঝাড়, ছড়া ও জলাশয় থাকতে হবে, কিন্তু নানা কারণে বনভূমি কমে গেছে। দেশে বর্তমানে কতটি হাতি আছে, তারা কোন পথে চলাচল করছে এবং কোন আবাসস্থল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে—এসব তথ্য ছাড়া কার্যকর সংরক্ষণ পরিকল্পনা সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।




