মশা, মাছি, পিঁপড়া কিংবা তেলাপোকা—পৃথিবীর প্রায় সব পরিবেশেই এদের দেখা মেলে। মাটি, আকাশ, মিঠা পানির জলাশয় বা দুর্গম অরণ্য—সবখানেই এরা খাপ খাইয়ে নিয়েছে। কিন্তু এমন একটি জায়গা আছে যেখানে এদের খুঁজে পাওয়া যায় না, সেটি হলো সমুদ্র। গ্রহের তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে থাকা বিশাল জলরাশিতে পোকামাকড়ের কোনো অস্তিত্ব নেই। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, সমুদ্রের গভীরের প্রচণ্ড জলের চাপে পোকামাকড়ের শ্বাসতন্ত্র ধ্বসে পড়ে, ফলে তারা সেখানে টিকে থাকতে পারে না। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণা এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।

গবেষকরা দেখিয়েছেন, আফ্রিকার মালাউই হ্রদে পাওয়া চাওবোরাস এডুলিস (Chaoborus edulis) নামের এক প্রজাতির মাছির লার্ভা শিকারি মাছের হাত থেকে বাঁচতে হ্রদের প্রায় ২৫৮ মিটার গভীরে ডুব দিতে সক্ষম। ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার প্রাণিবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষণার সহ-লেখক ফিলিপ ম্যাথিউস জানান, একটি ক্ষুদ্র পতঙ্গের পক্ষে এত গভীরে টিকে থাকা বিজ্ঞানীদের কল্পনার বাইরে ছিল। সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে লার্ভাগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন বিজ্ঞানীরা। তাঁরা দেখেন, রাতের অন্ধকারে মাছের ভয় কম থাকলে লার্ভাগুলো পানির ওপরের দিকে ভেসে বেড়ায়, কিন্তু দিনের আলো ফুটলেই শিকারির উপস্থিতি বেড়ে গেলে তারা ২৫৮ মিটার গভীরে নেমে যায়।

এত গভীরে জলের প্রচণ্ড চাপে কীভাবে বাঁচে, তা জানতে কিছু লার্ভা গবেষণাগারে নিয়ে পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। সেখানেই বেরিয়ে আসে চমকপ্রদ তথ্য। পোকামাকড়ের শ্বাসযন্ত্র মূলত রেসিলিন নামের এক বিশেষ প্রোটিন দিয়ে গঠিত। অন্যান্য পোকামাকড়ের ক্ষেত্রে এই প্রোটিন সাধারণত শক্তি সঞ্চয় বা বাইরের খোলস রক্ষার কাজে নিষ্ক্রিয় থাকে। কিন্তু মালাউই হ্রদের মাছিদের শরীরে রেসিলিন প্রোটিন জলের চাপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংকুচিত ও প্রসারিত হতে পারে। ফলে প্রচণ্ড গভীরতার চাপেও তাদের বাতাসের থলি চুপসে যায় না। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিওর জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক নাতাশা মাত্রে এই গবেষণাকে ‘অসাধারণ’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, একটি প্রাণীর জৈব রসায়ন কীভাবে তার শারীরিক কাঠামো নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেই কাঠামো কীভাবে তাকে নির্দিষ্ট পরিবেশে টিকিয়ে রাখে, তা এই গবেষণায় চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে এই আবিষ্কারের পরও মূল প্রশ্নটি অমীমাংসিত রয়ে গেছে—জলের চাপ যদি বাধা না হয়, তবে সমুদ্রের লোনা পানিতে পোকামাকড় স্থায়ীভাবে বাসা বাঁধতে পারে না কেন? ফিলিপ ম্যাথিউস বলেন, ‘আমরা অন্তত এটুকু প্রমাণ করেছি যে জলের চাপ কোনো অলঙ্ঘনীয় বাধা নয়। কিন্তু সমুদ্রের বিশাল ও রহস্যময় পরিবেশে ঠিক কোন উপাদান তাদের ঢুকতে বাধা দিচ্ছে, সেই প্রশ্নটি এখনো অজানা।’ ভবিষ্যতে নতুন কোনো গবেষণা হয়তো এই রহস্যের সমাধান নিয়ে আসতে পারে। সূত্র: সায়েন্টিফিক আমেরিকান।