বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় যে প্রাণীরা বাস করে, তাদের মধ্যে হাঙর বা শাপলাপাতা মাছের কথা অনেকেই জানেন না। কক্সবাজারের মাছঘাটে গবেষণার সময় একটি গিটারফিশের দেখা পেয়ে প্রথমে বিস্মিত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের এক শিক্ষার্থী। মাথার অংশটা ছিল গিটারের মতো চওড়া, আর শরীরটা হাঙরের মতো লম্বা। এই প্রাণীটি মূলত দুই জগতের সংমিশ্রণ। পীতাম্বরী নামে পরিচিত এই গিটারফিশ, শাপলাপাতা ও হাঙর মূলত তরুণাস্থি দিয়ে গঠিত মাছ। মানুষের নাক বা কানের নরম অংশের মতো তাদের শরীরে শক্ত হাড়ের বদলে নমনীয় কার্টিলেজ থাকে, ফলে তারা হালকা ও দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে পারে।

বিবর্তনের ইতিহাস বলছে, ডাইনোসর পৃথিবীতে আসার বহু আগে, প্রায় ৪০ কোটি বছর আগে হাঙরদের পূর্বপুরুষেরা সমুদ্রে সাঁতার কাটত। ডাইনোসর বিলুপ্ত হয়ে গেলেও আজও টিকে আছে তারা। ঘোলা পানিতে শিকার খুঁজে পেতে হাঙররা নির্ভর করে এক বিশেষ ইন্দ্রিয়ের ওপর—ইলেকট্রোরিসেপশন। জীবন্ত প্রাণীর শরীর থেকে নির্গত ক্ষুদ্র বৈদ্যুতিক সংকেত অনুভব করে এরা শিকারের অবস্থান নিশ্চিত করে। অন্যদিকে শাপলাপাতা মাছের চওড়া শরীর ধীরে ধীরে নাড়িয়ে পানির নিচে উড়ার মতো ভঙ্গিতে চলাফেরা করে। ম্যান্টা রে নামের প্রজাতিটির ডানার বিস্তার সাত মিটারের বেশি হতে পারে, যা একটি ছোট গাড়ির দৈর্ঘ্যের সমান।

বাংলাদেশের সমুদ্রে করাত মাছ ও হাতুড়ি হাঙরের মতো আরও দুটি উল্লেখযোগ্য প্রজাতি দেখা যায়। করাত মাছের মুখের সামনের অংশটি করাতের মতো চওড়া, যার দুই পাশে ধারালো দাঁতের সারি থাকে। বালুর নিচে লুকিয়ে থাকা শিকার খুঁজে বের করার জন্য এই অঙ্গটি ব্যবহৃত হয়। অতীতে বাংলাদেশের সমুদ্রে তিন প্রজাতির করাত মাছ পাওয়া যেত, কিন্তু এখন তারা বিশ্বের সবচেয়ে বিপন্ন মাছের তালিকায়। হাতুড়ি হাঙরের মাথা হাতুড়ির মতো চওড়া, দুই পাশে অবস্থিত চোখের কারণে অন্য হাঙরের তুলনায় তারা ভালো দেখতে পায়। দেশে তিন প্রজাতির হাতুড়ি হাঙর দেখা যায়। সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বাংলাদেশের উপকূল থেকে গিটারফিশের একটি নতুন প্রজাতি শনাক্ত করেছেন, যার নাম দেওয়া হয়েছে Glaucostegus younholeei। পৃথিবীর অন্য কোথাও নয়, প্রথমবারের মতো এই প্রজাতির সন্ধান মিলেছে বাংলাদেশের জলসীমাতেই।

অনেকে মনে করেন হাঙর শুধু অস্ট্রেলিয়া বা হলিউডের সিনেমাতেই দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবে কক্সবাজার, টেকনাফ, সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা ও সুন্দরবনের উপকূলীয় এলাকায় নিয়মিত এসব প্রাণীর দেখা মেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সমুদ্রে প্রায় ১০০’র বেশি প্রজাতির হাঙর, শাপলাপাতা ও তাদের আত্মীয়রা বাস করে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই প্রজাতিগুলোর অনেকগুলিই আজ হুমকির মুখে। হলিউডের সিনেমায় হাঙরকে আক্রমণাত্মক দেখানো হলেও বাস্তবে ৫০০’র বেশি প্রজাতির হাঙরের মধ্যে খুব কমই মানুষের প্রতি আগ্রহ দেখায়। মানুষের অনুপ্রবেশের ফলে হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতি আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণ করে। সঠিক সচেতনতা থাকলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন গবেষকেরা।

হাঙর ও শাপলাপাতা মাছের প্রজনন হার খুবই কম। বেশির ভাগ প্রজাতিই মানুষের মতো জীবন্ত বাচ্চা জন্ম দেয় এবং বাচ্চা দিতে শুরু করতে কয়েক বছর সময় লাগে। তাই একবার সংখ্যা কমে গেলে আগের অবস্থায় ফিরে আসতে অনেক সময় লাগে। অতিরিক্ত মাছ ধরা, জালে আটকা পড়া, সমুদ্রদূষণ, উপকূলীয় পরিবেশের ক্ষতি এবং অবৈধ বাণিজ্য—সব মিলিয়ে এরা আজ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে। কিছু দেশে হাঙরের পাখনার স্যুপ খাওয়ার প্রচলনের কারণে তাদের শরীরের অংশ সংগ্রহ করা হয়। সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রে হাঙর ও শাপলাপাতা মাছ ভারসাম্য রক্ষাকারী হিসেবে কাজ করে। তারা অসুস্থ ও দুর্বল প্রাণীদের নিয়ন্ত্রণ করে খাদ্যশৃঙ্খলকে সুস্থ রাখে। সংখ্যা অস্বাভাবিক কমে গেলে খাদ্যজালে যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, তাকে বিজ্ঞানীরা ‘ট্রফিক ক্যাসকেড’ বলেন। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত মানুষের ওপরও পড়তে পারে, কারণ মানুষ যে সামুদ্রিক মাছের ওপর নির্ভরশীল, তারা এই খাদ্যজালেরই অংশ। তাই হাঙর রক্ষা মানে পুরো সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে সুস্থ রাখা। গবেষকদের মতে, এই প্রাণীদের সম্পর্কে জানা এবং তাদের রক্ষা করা শুধু বিজ্ঞানীদের কাজ নয়, এটি সবার দায়িত্ব।