মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের মোকামবাজার–অফিস বাজার সড়কের আজমেরু গ্রামের একটি অংশ এখন স্থানীয়দের কাছে ‘ফুলের সড়ক’ হিসেবে পরিচিত। সবুজ ধানখেতের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া এই সরু গ্রামীণ পথটির দুই পাশে ফুটে থাকা বিভিন্ন রঙের ফুল পথচারী ও যানবাহনের যাত্রীদের নজর কাড়ছে। সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী সিএনজিচালিত অটোরিকশা, টমটম কিংবা ছোট-বড় যানের যাত্রীরা এই দৃশ্য দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের কাছে প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন জাতের ফুলের গাছ রয়েছে। কোথাও সাদা, কোথাও বেগুনি, আবার কোথাও হালকা বেগুনি রঙের ফুল ফুটে আছে। সম্প্রতি বৃষ্টিতে ধুয়ে গাছগুলো আরও সতেজ ও প্রাণবন্ত দেখাচ্ছে। বর্ষার এই সময়ে গ্রামীণ পথে ধানখেত, ডোবায় মাছ ধরা, সাদা বকের দল—এসব দৃশ্য বাংলাদেশের বহু জায়গায় চোখে পড়লেও আজমেরুর এই অংশটি ফুলের কারণে আলাদা সৌন্দর্য তৈরি করেছে।
সড়কের দুই পাশে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে ফুরুসের গাছ। ডালে ডালে ফুল ফুটে থাকায় দূর থেকেই তা নজর কাড়ে। কিছুক্ষণ আগে হওয়া বৃষ্টির পানি ফুলের পাপড়িতে জমে থাকায় ফুলগুলো আরও স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। ফুরুসের ফুল সাধারণত গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে বেশি ফোটে। এছাড়াও পার্পল ফানেল ভাইনসহ আরও কিছু পরিচিত-অপরিচিত ফুলের গাছ রয়েছে এখানে। কোনো গাছের ফুলের রং গাঢ়, কোনোটি আবার হালকা। সব মিলিয়ে পুরো সড়কের দুই পাশ যেন ছোট ছোট ফুলের বাগানে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের ভাষ্যে কেউ একে ‘ফুলের এলাকা’ বলছেন, কেউবা বলছেন ‘ফুলের সড়ক’।
সড়কের এক পাশে বেশ কিছু হিজলগাছ রয়েছে। সাধারণত হাওর ও জলাভূমির আশপাশে এই গাছ বেশি দেখা যায়। হিজলের ফুল বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠ মাসে ফোটে এবং সন্ধ্যার পর ফুটতে শুরু করে গভীর রাতে পূর্ণতা পায়। সকালে ঝরে পড়া ফুলে গাছের নিচে যেন হালকা গোলাপি চাদর বিছানো থাকে। যদিও এখন হিজল ফুলের মৌসুম নয়, তবুও দু-একটি গাছে হিজল ফুলের ঝালর দেখা গেছে, যার সুবাস মিষ্টি ও মাদকতাময়।
বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের দক্ষিণ পাশে অলকানন্দার সারি চোখে পড়ে। পাশাপাশি বেড়ে ওঠা এসব গাছ সবুজের একটি প্রাকৃতিক প্রাচীর তৈরি করেছে, যার ফাঁকে ফুটে আছে হলুদ ফুল। বিকেলের আলোয় ফুলগুলো আরও উজ্জ্বল ও মোহনীয় হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া নাম ‘অলকানন্দা’; এর আদিভূমি ব্রাজিল। হলুদ ছাড়াও সাদা, বেগুনি ও খয়েরি রঙের জাত আছে। অ্যালামন্ডা, ঘণ্টাফুল ও মাইক ফুল নামেও পরিচিত এই লতা ও গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ।
বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজের পূর্ব দিকে সড়কের দুই পাশে সারি সারি জারুলগাছ। বর্তমানে জারুল ফুল না থাকলেও শাখা-প্রশাখায় থোকায় থোকায় ফল ঝুলছে। সাধারণত গ্রীষ্মকাল থেকে বর্ষার শুরু পর্যন্ত বেগুনি, হালকা বেগুনি ও গোলাপি রঙের জারুল ফুল ফোটে। নিম্নভূমি, হাওর ও জলাভূমির আশপাশে এই গাছের দেখা বেশি মেলে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সড়কের পাশের গাছগুলোতে ফুল ফুটলে জায়গাটির চেহারাই বদলে যায়। গাছে গাছে ফুল ফুটে থাকলে পুরো সড়কটি মনোরম হয়ে ওঠে এবং দূরদূরান্ত থেকে অনেকে ফুল দেখতে এখানে আসেন। বার্ড পার্ক অ্যান্ড ইকো ভিলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এলাকার সৌন্দর্য বাড়ানোর উদ্দেশ্যেই সড়কের দুই পাশে এসব ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সড়কের মাঠের অংশের দুই পাশেও স্থানীয় জাতের পাশাপাশি আরও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে উন্মুক্ত জায়গায় গাছ লাগিয়ে তা টিকিয়ে রাখা সহজ নয় বলে মনে করছে কর্তৃপক্ষ। গাছ রক্ষায় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাও প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন। ধানখেতের সবুজের মাঝ দিয়ে যাওয়া এই পথ একদিন হয়তো আরও দীর্ঘ ফুলের সড়কে পরিণত হবে—যেখানে গন্তব্যের চেয়ে পথের সৌন্দর্যই বেশি আকর্ষণ তৈরি করবে।




