ওষুধের দাম এক মাসের ব্যবধানে ৪০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকায় ওঠার মতো ঘটনা কীভাবে সম্ভব—এই প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সময়ে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি অংশ ওষুধ কিনতেই খরচ হয়, যার সিংহভাগ রোগীদের নিজের বহন করতে হয়। সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ এখনও পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে, ওষুধের মূল্য নির্ধারণে সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ায় জনসাধারণের ওপর আর্থিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদিও ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের প্রতিনিধিরা মনে করেন, মুক্ত বাজার প্রতিযোগিতাই দাম নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি কার্যকর হতে পারে। শনিবার বিকেলে ‘ওষুধের দাম: কী যুক্তি? কার যুক্তি? সমাধান কী?’ শীর্ষক একটি ওয়েবিনারে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় শিক্ষক, আইনজীবী, জনস্বাস্থ্যবিদ ও ওষুধ শিল্পের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। ওয়েবিনারে রোগীদের ওষুধ ব্যয় সহনীয় রাখা, ওষুধশিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ, দাম নির্ধারণের পদ্ধতি এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাষ্ট্রের দায়িত্ব—এই চারটি দিক নিয়ে মতবিনিময় হয়।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৮২ সালের ড্রাগস কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্সে সরকারকে সব ধরনের ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের নতুন আইনের মাধ্যমে সরকারের নিজের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করা হয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, সরকার নির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে কেবল সেসব ওষুধের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করবে; কিন্তু সেই তালিকা এখনও প্রস্তুত হয়নি। অনিয়ন্ত্রিত মূল্যবৃদ্ধির একটি উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের আগস্টে উৎপাদিত একটি ওষুধের গায়ে মূল্য লেখা ছিল ৪০০ টাকা, অথচ সেপ্টেম্বরে উৎপাদিত একই ওষুধের দাম দাঁড়িয়েছে ১ হাজার টাকা। এক মাসে ৬০০ টাকা বৃদ্ধির এই ঘটনা কীভাবে সম্ভব—এই প্রশ্ন তোলেন তিনি।

অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০০৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০০৬ বাতিলের সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন জনস্বাস্থ্যবিদ মুশতাক হোসেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অংশীদারদের—বিশেষত ঔষধ শিল্প মালিকদের—মতামত পুরোপুরি প্রতিফলিত না হওয়ার অজুহাতে পুরো ব্যবস্থাপনা বাতিল করে বাজারকে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রতিযোগিতার বদলে সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তার মতে, সম্পূর্ণ বাতিল না করে আরও আলোচনা ও সংশোধনের সুযোগ রাখা যেত।

স্থানীয় বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বাংলাদেশে ওষুধ তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায় বলে মন্তব্য করেন রেনাটা লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কায়সার কবির। সরাসরি মূল্য নিয়ন্ত্রণ এ দেশে কার্যকর নয় বলে তিনি মনে করেন। তার মতে, মূল্য নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো জটিল রোগের চিকিৎসার দায়িত্ব সরকারের নেওয়া উচিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (বিএপিআই) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোসাদ্দেক হোসেন জানান, দেশের ওষুধের চাহিদার ৯৮ শতাংশ স্থানীয় শিল্প থেকেই পূরণ হয় এবং প্রায় সব প্রয়োজনীয় ওষুধ দেশেই তৈরি হচ্ছে। মানসম্মত উৎপাদনের স্বার্থে দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দীর্ঘ সময় অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টি ওষুধের দাম সমন্বয় না করায় কিছু ওষুধ এখন বাজারে অনুপস্থিত। নেতিবাচক মুনাফার কারণে কোম্পানিগুলো সেগুলো উৎপাদন বন্ধ রেখেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলার ভিত্তিতে অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টি ওষুধের দাম নির্ধারণের বিধান ছিল। কিন্তু ১৯৯৪ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এই ওষুধগুলোর দাম কোনো সময়েই সম্মিলিতভাবে সমন্বয় করা হয়নি। এর ফলে ওষুধ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি আরও জানান, মূল্য সমন্বয়ের দায়িত্ব একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিবর্তে সরকার পরিচালিত কমিটির হাতে থাকায় জনরোষের আশঙ্কায় প্রয়োজনীয় সমন্বয় বারবার আটকে থাকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক জানান, এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ৮৩০ কোটি টাকার ওষুধ সরবরাহ করেছিল। তবে এটি চাহিদার তুলনায় এখনও পর্যাপ্ত নয়। তিনি সরকারি ওষুধ খোলাবাজারে বিক্রি বন্ধে কঠোর তদারকির আহ্বান জানান এবং ‘জেনেরিক’ নামে ওষুধ বিক্রির বিষয়টি বিবেচনার তাগিদ দেন। ওয়েবিনারে অংশগ্রহণকারীরা একমত হন যে, বাজারের স্বচ্ছতা ও সরকারি তদারকির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই ওষুধের দাম ও সরবরাহ—উভয় ক্ষেত্রেই স্থিতিশীলতা আনা সম্ভব।