আইভরি কোস্টের তরুণ ফুটবল প্রতিভা ইয়ান দিয়োমান্দের ক্যারিয়ার যেন এক রূপকথার গল্প। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে অচেনা এক কিশোর থেকে রিয়াল মাদ্রিদের সম্ভাব্য তারকা হয়ে ওঠা—এমন উত্থান সত্যিই বিরল। চলতি মৌসুম শেষে স্প্যানিশ জায়ান্টদের সঙ্গে তাঁর চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, আনুষ্ঠানিকতা বাকি মাত্র।

দিয়োমান্দের যাত্রা শুরু ২০২৫ সালের মার্চে, আন্তর্জাতিক বিরতির সময়। চোট নিয়ে লেগানেসের রিজার্ভ দলে যোগ দেওয়া এই আইভোরিয়ান তরুণকে কেউই চিনতেন না। তিন দিনের মাথায় তিনি খেলেন রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে লা লিগায়। সেই অভিষেকের নেপথ্যে ছিল লেগানেসের মালিক জেফ লুনাওয়ের চোখ। তিনি ক্লাবের তৎকালীন কোচ বোর্হা হিমেনেসকে একটি ইউটিউব ভিডিও দেখিয়ে বলেছিলেন, 'আমরা নতুন মেসিকে পেয়ে গেছি।' ভিডিওতে তখন ১৬ বছর বয়সী দিয়োমান্দের খেলা দেখে হিমেনেসও বিস্মিত হন।

হিমেনেসের বর্ণনায়, রিজার্ভ দলের প্রীতি ম্যাচে দিয়োমান্দের প্রথম ছয়টি আক্রমণই ছিল অসাধারণ। প্রতিবারই প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে, দারুণ স্পর্শে বল নিয়ন্ত্রণ করে কিংবা জোরালো শটে জাল খুঁজে নেন। এতটাই ক্ষিপ্র ছিলেন যে ফাউলের আশঙ্কায় ম্যাচের মাঝপথেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়। এই পারফরম্যান্সই তাঁকে রিয়ালের বিপক্ষে মাঠে নামার সুযোগ এনে দেয়। সেবার তিনি জার্সি বদল করেন কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে, যদিও তাঁর প্রয়াত বোন রোকসান দাবি করতেন ভাই এমবাপ্পের চেয়েও ভালো।

রোকসানের মৃত্যু দিয়োমান্দের জীবন বদলে দেয়। এক পার্টিতে কারও দেওয়া পানীয়ে মিশে যাওয়া কিছু তাকে কেড়ে নেয় মাত্র ১৫ বছর বয়সে। 'দ্য প্লেয়ার্স ট্রিবিউন'-এ লেখা চিঠিতে দিয়োমান্দে জানান, তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি। হিংসা বা দেশের বাস্তবতা—কেন এমন হলো, আজও জানেন না তিনি। এই শোককে শক্তিতে পরিণত করে ফুটবলেই মন দেন তিনি।

লেগানেসে মাত্র দেড় মাস খেলেই দলটিকে অবনমন থেকে বাঁচানোর মতো প্রভাব ফেলেছিলেন দিয়োমান্দে। হিমেনেসের মতে, তিনি জানুয়ারির শুরুতেই দলে থাকলে লেগানেস কনফারেন্স লিগে খেলতে পারত। প্রতিটি ম্যাচেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো পারফরম্যান্স ছিল তাঁর। এর জেরে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে লাইপজিগে যোগ দেন তিনি। সেখানে দর-কষাকষির সময় হিমেনেস বলেছিলেন, দুই কোটি ইউরো অনেক বেশি নয়, বরং এক-দুই বছরের মধ্যে তাঁর দাম দ্বিগুণ-তিনগুণ হবে। শেষ পর্যন্ত রিয়াল তাঁকে কিনতে খরচ করছে ১২ কোটি ইউরো—ছয় গুণ বেশি।

জাতীয় দলেও দিয়োমান্দে ইতিহাস গড়েছেন। ২০২৬ বিশ্বকাপে আইভরি কোস্টের হয়ে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে অভিষেক, সর্বকনিষ্ঠ হিসেবে অ্যাসিস্ট—দুটি রেকর্ডই তাঁর। ইকুয়েডরের বিপক্ষে উদ্বোধনী ম্যাচে ম্যাচসেরাও হন তিনি। বর্তমানে তাঁর মূল শক্তি দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, দুর্দান্ত ড্রিবলিং ও ধারাবাহিক পারফরম্যান্স।

সফলতা তাঁকে বদলাতে পারেনি। অর্থের প্রতি মোহ কেটে গেছে তাঁর। লেগানেসে থাকাকালে আয় করা সব টাকা বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। নিজের কোনো ফ্ল্যাট ছিল না, থাকতেন অনুশীলন কেন্দ্রের ছোট্ট ঘরে। সেখানে টিভিও ছিল না—শুধু ফুটবল আর ঘুম। রিয়াল মাদ্রিদের মতো ক্লাবে পা মাটিতে রাখার এই গুণই তাঁকে আরও দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।