ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার ব্যালন ডি’অর নিয়ে বিশ্বকাপ পরবর্তী জল্পনা এখন তুঙ্গে। স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় আছেন বিশ্বকাপজয়ী তারকারা, বিশেষ করে বিশ্বকাপের সেরা ঘোষিত রদ্রি। কিন্তু ম্যানচেস্টার সিটির এই মিডফিল্ডার চোটের কারণে ক্লাবের হয়ে অনেকটা সময়ই মাঠের বাইরে ছিলেন। অন্যদিকে, বার্সেলোনার তরুণ প্রতিভা লামিনে ইয়ামাল ঘরোয়া আসরে জ্বলে উঠলেও বিশ্বমঞ্চে তেমন ছাপ রাখতে পারেননি। এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, কোনো শিরোপা না জিতেও কি কিলিয়ান এমবাপ্পে বা হ্যারি কেইনের পক্ষে এই পুরস্কার জেতা সম্ভব? লিওনেল মেসির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, তবে কেইন অন্তত বুন্দেসলিগা জিতেছেন, মেসি জিতেছেন এমএলএস ট্রফি। এমবাপ্পে কিন্তু ক্লাব কিংবা দেশ— কোনো পর্যায়েই কোনো বড় ট্রফি জেতেননি। তবুও ফুটবল ইতিহাস বলছে, হাতে কোনো বড় শিরোপা না রেখেও এই মর্যাদার সম্মান জেতা একেবারেই অসম্ভব নয়। নব্বইয়ের পর থেকে এ পর্যন্ত তিনজন এমন অসাধ্য সাধন করেছেন।
লাইবেরিয়ার হয়ে উঠে আসা জর্জ উইয়াহকে একসময় ‘দ্য ব্ল্যাক বিস্ট’ নামে ডাকা হতো। ১৯৯৪-৯৫ মৌসুমে প্যারিস সেন্ট জার্মেইয়ের (পিএসজি) জার্সি গায়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ৮ গোল নিয়ে দলকে তিনি সেমিফাইনালে তুলেছিলেন, যেখানে তাদের যাত্রা থামায় এসি মিলান। পিএসজি ওই আসরে দুটি ঘরোয়া কাপ জিতলেও লিগ শিরোপা বা ইউরোপিয়ান ট্রফি জয় অধরাই ছিল। জুলাই মাসে মিলানে পাড়ি জমিয়ে উইয়াহ প্রথম মৌসুমেই দলের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে ওঠেন এবং রবার্তো বাজ্জো ও দেয়ান সাভিচেভিচের সাথে ভয়ংকর এক আক্রমণভাগ গড়ে তুলেন। কিন্তু ১৯৯৫-এর ডিসেম্বরে তাঁর নাম ঘোষিত হওয়ার মুহূর্তটিতেও দলীয় কোনো বড় শিরোপার স্বাদ তিনি পাননি। ১৪৪ পয়েন্ট নিয়ে তিনি পেছনে ফেলেন ইয়ুর্গেন ক্লিন্সমানকে, এবং প্রথম অ-ইউরোপীয় ও প্রথম আফ্রিকান খেলোয়াড় হিসেবে ব্যালন ডি’অরের মালিক হন।
অন্যদিকে লুইস ফিগো ছিলেন বার্সেলোনার প্রাণভোমরা। ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে তিনি লা লিগায় ৩২ ম্যাচে ৯ গোল ও ১২ অ্যাসিস্ট করে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখালেন। কিন্তু সেবার কাতালানরা লিগ জিততে পারেনি, বা তাদের ঘরে আসেনি কোনো উল্লেখযোগ্য শিরোপা। ইউরো ২০০০-এ পর্তুগালকে নেতৃত্ব দিয়েছেন সেমিফাইনালে নিয়ে, সেখানে ফ্রান্সের কাছে গোল্ডেন গোলে পরাজিত হতে হয়। সেই জুলাইয়ে তিনি রেকর্ড গড়া ট্রান্সফার ফির মাধ্যমে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন, যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ন্যু ক্যাম্পে ওঠে ‘বিশ্বাসঘাতক’ খচিত ব্যানার ও শুকরের কাটা মাথা। কিন্তু ডিসেম্বরে যখন ব্যালন ডি’অরের ঘোষণা এলো, জিনেদিন জিদানকে পেছনে ফেলে ফিগোর কপালে ওঠে ব্যালন ডি’অরের মুকুট। অথচ, ওই মৌসুমে তার কোনো দলই লিগ বা চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় করতে পারেনি।
সবশেষ উদাহরণ ২০১৩ সালের অদ্ভুত এক ঘটনা। বায়ার্ন মিউনিখ সেই বছর ট্রেবল অর্থাৎ বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ — সবই জিতেছিল। আর ফ্রা রিবেরি ছিলেন সেই অভিযানের মূল নায়ক। কিন্তু জুরিখের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মঞ্চে ওঠেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। সেই বছর রিয়াল মাদ্রিদ কোপা দেল রে-এর ফাইনালে হারে, চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে বরুসিয়া ডর্টমুন্ডের কাছে বিদায় নেয়। ব্যক্তি কদলে রোনালদো কোনো শিরোপার দেখা পাননি, তবে করেছিলেন ৬৯ গোল, যা মেসি (৪৫) ও রিবেরির (২৩) মিলিত গোলের থেকেও বেশি ছিল। চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনিই হয়েছিলেন ১২ গোল করে। পরে রিবেরি ক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন, জানিয়েছিলেন তিনি সবই জিতেছেন, অথচ রোনালদো কিছুই জেতেননি।
রিয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে এমবাপ্পের দ্বিতীয় মৌসুম শেষ হলো একই রকম পুরোনো চিত্রনাট্যে — দারুণ ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, তবুও দলীয় ট্রফি শূন্য। লা লিগায় ২৫ গোল করে টানা দ্বিতীয়বারের মতো পিচিচি ট্রফি জিতলেও, বার্সেলোনার পেছনে থেকে মৌসুম শেষ করতে হয়েছে দলকে। ১৫ গোল নিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েও দল কোয়ার্টার ফাইনালেই বিদায় নিয়েছে। অর্থাৎ টানা দুই মৌসুম রিয়াল মাদ্রিদ বড় কোনো শিরোপা ছাড়াই কাটিয়েছে। বিশ্বকাপে ৮ ম্যাচে ১০ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট এবং সবমিলিয়ে আসরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন। ফ্রান্স থেমেছে সেমিফাইনালে। তিনটি ভিন্ন ভিন্ন প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া সত্ত্বেও কোনো ট্রফির দেখা পাননি এমবাপ্পে। এই পরিস্থিতিতে পুরোনো এই ইতিহাসের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে চতুর্দিকে জল্পনা শুরু হয়েছে।




