গত সপ্তাহে পবিত্র নগরী মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক এবং পাকিস্তানের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির মূল কথা হলো, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে। তবে তুরস্কের জোরালো প্রচেষ্টা সত্ত্বেও এই জোটে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি হয়নি সৌদি আরব। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত সৌদি রাজপরিবারের সাবেক এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা এবং আরও দুজন কর্মকর্তা মিডল ইস্ট আই-কে জানিয়েছেন, রিয়াদ বর্তমানে মিসরের অংশগ্রহণের বিপক্ষে।

সৌদি কর্মকর্তাদের মতে, প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির সরকারের প্রতি রিয়াদের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এই সিদ্ধান্তের পেছনে কাজ করেছে। ২০১৩ সালে সিসি ক্ষমতায় আসার পর সৌদি আরব তাকে ব্যাপক আর্থিক সহায়তা প্রদান করলেও, গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ইস্যুতে কায়রোর কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি রিয়াদ। সৌদি আরবের ধারণা, এক সময়ের কৌশলগত ও সামরিক প্রভাব এখন মিসরের নেই এবং দেশটি এখন কেবল উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে কায়রোর ঘনিষ্ঠতা সৌদি আরবকে আরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। দক্ষিণ ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকে আবুধাবির সমর্থন দেওয়া নিয়ে রিয়াদের সঙ্গে আমিরাতের বিরোধ রয়েছে, যা সৌদি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করে রিয়াদ। অথচ ইরানের হামলার সময় মিসর দ্রুত আবুধাবিতে যুদ্ধবিমান ও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পাঠিয়েছিল, যা সৌদি আরবের ক্ষেত্রে করেনি। এছাড়া সোমালিল্যান্ড, ইসরায়েল, ইথিওপিয়ার বাঁধ বিতর্ক এবং সুদানের র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের বিষয়ে আমিরাতের সাথে মিসরের কৌশলগত সংগতি রিয়াদের সন্দেহ আরও ঘনীভূত করেছে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, কারিগরি জটিলতা দূর হলে ভবিষ্যতে মিসর এই জোটে যোগ দিতে পারে। তুর্কি সূত্রগুলো দাবি করেছে যে, মিসর নিজেই চুক্তিতে যোগ দিতে প্রস্তুত ছিল না বলে বাকি দেশগুলো এগিয়ে গেছে। তবে সৌদি কর্মকর্তারা এই দাবিকে 'হাস্যকর' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের মতে, সিসি আর্থিক সুবিধা পেতেন তবে অবশ্যই এই চুক্তিতে যোগ দিতেন।

সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও মিসরের চেয়ে তুরস্ক ও পাকিস্তানের অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে রিয়াদ। তুরস্কের আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প এবং পাকিস্তানের শক্তিশালী অস্ত্র উৎপাদন খাতের তুলনায় মিসরের সামরিক উৎপাদন মূলত বেসামরিক পণ্যের দিকে বেশি ঝুঁকে আছে। এছাড়া মিসর সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান যুদ্ধপ্রস্তুতি এবং কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সৌদি নীতিনির্ধারকরা। একসময় কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর প্রধান সামরিক সহযোগী হিসেবে মিসরের যে গুরুত্ব ছিল, এখন তা হ্রাস পেয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কুয়েত এখন মিসরের চেয়ে মক্কা চুক্তিতে যোগ দিতে বেশি আগ্রহী। তবে সৌদি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ভবিষ্যতে মিসরের জন্য পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি, তবে আপাতত তাদের বাইরে রাখাই রিয়াদের সিদ্ধান্ত।