ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান শুরুর পর প্রায় পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি। সম্প্রতি তুরস্কে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে দেশে ফেরার পথে গোপন কৌশলে বিমান বদলের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে তাঁর নিরাপত্তা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ আগ্রাসন শুরুর পরদিন এবিসি নিউজের প্রতিবেদক জোনাথন কার্লের সঙ্গে এক টেলিফোন আলাপে ট্রাম্প বলেছিলেন, 'সে আমাকে আঘাত করার আগেই আমি তাকে আঘাত করেছি। তারা দুবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমি আগে তাকে আঘাত করেছি।' ওই অভিযানের প্রথম দিনেই ইসরায়েলের বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। সেই সঙ্গে দেশটির আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতাও প্রাণ হারান। ট্রাম্প অতীতে ইরানিদের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে আসা বিভিন্ন হুমকি ও কথিত হত্যাচক্রান্তের সঙ্গেই এই হামলার সম্পর্ক টেনে দেখিয়েছিলেন।

তবে যুদ্ধ শুরুর পর এত দিনে ট্রাম্পকে এ ধরনের মন্তব্য করতে দেখা যায়নি। কিন্তু তাঁর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত মার্চে বলেছিলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে হত্যার চেষ্টা করেছিল ইরান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পই জয়ী হয়েছেন।' তিনি আরও দাবি করেন, ট্রাম্পকে হত্যার লক্ষ্যে গঠিত একটি দলের নেতৃত্বে থাকা এক অজ্ঞাতনামা ইরানি ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত হয়েছেন। এই মন্তব্যগুলো যুদ্ধটির ব্যক্তিগত মাত্রার দিকটিই তুলে ধরে। সেই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ও তাঁর নিরাপত্তা দলের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে যে, ইরান এখনো ট্রাম্পের জীবনের জন্য হুমকি হয়ে থাকতে পারে।

গত মাসে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে তুরস্ক থেকে ফেরার সময় ট্রাম্প ও তাঁর দলবল একটি উড়োজাহাজে ওঠার পর গোপনে সেটি থেকে নেমে বিকল্প আরেকটি উড়োজাহাজে যাত্রা করেছিলেন। এই সপ্তাহে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়ার পর সেই নিরাপত্তা উদ্বেগ নাটকীয়ভাবে সামনে চলে আসে। সেদিন গণমাধ্যমকর্মী এবং হোয়াইট হাউসের বেশিরভাগ কর্মীকে বিষয়টি জানানোই হয়নি। তাঁরা প্রেসিডেন্টের সরকারি এয়ারফোর্স ওয়ান ৭৪৭ উড়োজাহাজেই ফেরেন। ফলে উড়োজাহাজটি কার্যত ফাঁদ পাতা লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বিশ্বাস ছিল, এয়ারফোর্স ওয়ান লক্ষ্য করে ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য তাঁরা হাতে পেয়েছেন। এই আশঙ্কা থেকেই প্রেসিডেন্টের জন্য বিশেষ নিরাপত্তা কৌশল নেওয়া হয়েছিল। প্রেসিডেন্টকে তাঁর জন্য নির্ধারিত উড়োজাহাজ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখান থেকে গোপনে সরিয়ে নিতে একটি ক্যাটারিং ট্রাক ব্যবহার করা হয়। হোয়াইট হাউস এই হুমকি সম্পর্কে খুব কম তথ্য প্রকাশ করেছে। তবে সরকারি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো প্রেসিডেন্ট যুদ্ধক্ষেত্র বা তার কাছাকাছি অঞ্চলে ভ্রমণ করলে এ ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।

অতীতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা গোপনীয়তা বজায় রেখে আফগানিস্তান, ইরাক ও ইউক্রেনের মতো দেশে সফর করেছেন। তবে সাধারণত সংবাদমাধ্যমগুলো আগেভাগেই সফরের বিষয়ে কিছুটা অবগত থাকত, কিন্তু একটি সমঝোতার ভিত্তিতে সফর শেষ হওয়ার আগে তথ্য প্রকাশ করত না। এবার সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছে গণমাধ্যমকে। ক্যাটারিং ট্রাকে লুকিয়ে বিমান বদলের ঘটনাটি অনেকের চোখেই ভালোভাবে নিচ্ছে না। প্রায় পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধে ট্রাম্প বারবার বড় গলায় নিজেদের সামরিক শক্তি জাহির করেছেন এবং ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল বলেছেন। এখন সেই ট্রাম্পকে ইরানের সম্ভাব্য হামলার ভয়ে ক্যাটারিং ট্রাকে লুকিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে — এটি তাঁর শক্তিশালী নেতার ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক নয় বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইরানের হুমকি নতুন নয়। ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর ইরানের নেতারা ট্রাম্প ও তাঁর প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন। ২০২২ সালে জন বোল্টনকে লক্ষ্য করে হামলা পরিকল্পনার তথ্য সামনে এলে জো বাইডেন প্রশাসন ইরানকে সতর্ক করেছিল। ২০২৪ সালে আসিফ মার্চেন্ট ও ফারহাদ শাকেরি নামের দুই ব্যক্তি ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে গ্রেপ্তার বা অভিযুক্ত হন। এসব হত্যাচেষ্টা পরিকল্পনার পর্যায়েই নস্যাৎ করা হয়েছিল, কিন্তু হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রচারণার সময় ট্রাম্প যে সত্যিই প্রাণ হারানোর ঝুঁকিতে ছিলেন, তা স্পষ্ট ছিল।

এ ছাড়া ২০২৪ সালে পেনসিলভানিয়ার বাটলারে এক সমাবেশে বন্দুকধারীর গুলিতে ট্রাম্প আহত হন এবং ফ্লোরিডায় গলফ খেলার সময় এক সশস্ত্র ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেমাফর–এর তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রায়ই নিজেকে হত্যাচেষ্টার লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে ভাবেন, এমনকি এ নিয়ে রসিকতাও করেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়, ট্রাম্প মজার ছলে বলেছিলেন, 'প্রেসিডেন্ট হওয়া যে এতটা বিপজ্জনক, তা কেউ আমাকে বলেনি। আর যদি বলত, তাহলে হয়তো আমি নির্বাচনে প্রার্থীই হতাম না।'

২০২৫ সালে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা এবং এ বছরের ব্যাপক বিমান হামলা ও নৌ অবরোধ ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের জন্য নতুন হুমকি তৈরি করেছে। জুলাই মাসে ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, ইরান তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, ইরান যদি হুমকি বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, তাহলে এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ট্রাম্পের তুরস্ক ত্যাগের আগের দিন খামেনির জানাজায় অংশগ্রহণকারীদের হাতে ট্রাম্পকে হত্যার বার্তা লেখা ব্যানার দেখা যায়। পরের সপ্তাহে তেহরানে ট্রাম্পকে কালো কফিনে শায়িত দেখানো ম্যুরাল আঁকা হয়।

ইরান অবশ্য ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে খামেনির মৃত্যু ও বেসামরিক নাগরিকদের হতাহতের পর ইরানিরা বলছে, এই যুদ্ধ এখনো শেষ হওয়ার অনেক বাকি। আর প্রতিশোধের লক্ষ্যবস্তুদের একজন হলেন ট্রাম্প নিজেই। তুরস্ক থেকে ফেরার পথে ট্রাম্প যখন আবার সাংবাদিকদের সঙ্গে একই উড়োজাহাজে ওঠেন, তখন তাঁরা অস্বাভাবিক সেই যাত্রা সম্পর্কে জানতে চান। ট্রাম্প বলেন, 'আমি সব সময়ই পড়ি, তাদের তালিকায় আমি এক নম্বর লক্ষ্যবস্তু।' এরপর রসিকতার সুরে তিনি বলেন, 'তবে আমি যদি মারা যাই, তাহলে আপনারা যাবেন—তাই না?'